ঢাকা ০৫:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

ইতালির বদলে লিবিয়ায় জিম্মি কুমিল্লার ৬ যুবক

মনোহরগঞ্জ (কুমিল্লা) প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ৩৪ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচাতে আর একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়েছিলেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ছয় যুবক। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে এখন তারা জিম্মি। মুক্তির জন্য দাবি করা হয়েছে দেড় কোটি টাকা। টাকা আদায়ে প্রতিনিয়ত চালানো হচ্ছে পাশবিক নির্যাতন, আর সেই নির্যাতনের ভিডিও পাঠানো হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের কাছে। সন্তানের অসহায় আর্তনাদ দেখে প্রতিদিন ভেঙে পড়ছেন স্বজনরা।
জিম্মি হওয়া যুবকেরা হলেন—খিলা ইউনিয়নের দিশাবন্দ গ্রামের শাহাদাত হোসেন (২০), মানিকুল ইসলাম (২০), মো. সোহেল (২৭), তাজ মোহাম্মদ (২৫), ফয়সাল (২০) এবং লক্ষণপুর ইউনিয়নের বেতিয়াপাড়া গ্রামের মেহেদী হাসান (২১)।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে জনপ্রতি ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা দিয়ে ইতালিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের মানবপাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রায় আট মাস আটকে রাখার পর সম্প্রতি আরও একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে একটি গোপন আস্তানায় আটকে রেখে প্রত্যেকের জন্য ২৫ লাখ টাকা করে, মোট দেড় কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে।
ছেলের নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মানিকুল ইসলামের বাবা মাহবুবুর রহমান। তিনি বললেন, ‘দিশাবন্দ গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে মানিকের মাধ্যমে ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে প্রায় নয় মাস আগে তার ভাই সামছুল আলম ২০ লাখ টাকা নেন। পরে মানিকুলকে লিবিয়ায় নেওয়া হলেও সেখানে তাকে একটি দালালচক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে মুক্তিপণের দাবিতে তার ছেলের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
একই সুরে অভিযোগ করলেন সোহেলের বাবা হারুনুর রশিদ। তার ভাষ্য, প্রায় আট মাস আগে সামছুল আলমের মাধ্যমে ১৮ লাখ টাকা দিয়ে ছেলেকে ইতালি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর সেও দালালচক্রের হাতে জিম্মি হয়। এখন মুক্তিপণের দাবিতে তার ওপরও নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
পরিবারগুলোর দাবি, দালালরা ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে দ্রুত টাকা পরিশোধের চাপ দিচ্ছে। ভিডিওতে যুবকদের আর্তচিৎকার ও নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য দেখে পরিবারগুলোর সদস্যরা চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্ত দালাল সামছুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা গত ১০ থেকে ১২ দিন ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে লিবিয়ায় অবস্থানরত মূল দালাল মানিকের সঙ্গেও এখন আর কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
ছয় যুবককে জীবিত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে তারা।
এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদ আহমেদ বলেন,এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান চালিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি লিবিয়ায় জিম্মি থাকা ছয় যুবককে দ্রুত উদ্ধার করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

ইতালির বদলে লিবিয়ায় জিম্মি কুমিল্লার ৬ যুবক

আপডেট সময় :

পরিবারের দারিদ্র্য ঘোচাতে আর একটি সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় ইতালির উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়েছিলেন কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলার ছয় যুবক। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস—গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই লিবিয়ায় মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে এখন তারা জিম্মি। মুক্তির জন্য দাবি করা হয়েছে দেড় কোটি টাকা। টাকা আদায়ে প্রতিনিয়ত চালানো হচ্ছে পাশবিক নির্যাতন, আর সেই নির্যাতনের ভিডিও পাঠানো হচ্ছে পরিবারের সদস্যদের কাছে। সন্তানের অসহায় আর্তনাদ দেখে প্রতিদিন ভেঙে পড়ছেন স্বজনরা।
জিম্মি হওয়া যুবকেরা হলেন—খিলা ইউনিয়নের দিশাবন্দ গ্রামের শাহাদাত হোসেন (২০), মানিকুল ইসলাম (২০), মো. সোহেল (২৭), তাজ মোহাম্মদ (২৫), ফয়সাল (২০) এবং লক্ষণপুর ইউনিয়নের বেতিয়াপাড়া গ্রামের মেহেদী হাসান (২১)।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ, স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে জনপ্রতি ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা দিয়ে ইতালিতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের মানবপাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। প্রায় আট মাস আটকে রাখার পর সম্প্রতি আরও একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে একটি গোপন আস্তানায় আটকে রেখে প্রত্যেকের জন্য ২৫ লাখ টাকা করে, মোট দেড় কোটি টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হচ্ছে।
ছেলের নির্যাতনের কথা বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন মানিকুল ইসলামের বাবা মাহবুবুর রহমান। তিনি বললেন, ‘দিশাবন্দ গ্রামের বেলাল হোসেনের ছেলে মানিকের মাধ্যমে ইতালি পাঠানোর আশ্বাস দিয়ে প্রায় নয় মাস আগে তার ভাই সামছুল আলম ২০ লাখ টাকা নেন। পরে মানিকুলকে লিবিয়ায় নেওয়া হলেও সেখানে তাকে একটি দালালচক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে মুক্তিপণের দাবিতে তার ছেলের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
একই সুরে অভিযোগ করলেন সোহেলের বাবা হারুনুর রশিদ। তার ভাষ্য, প্রায় আট মাস আগে সামছুল আলমের মাধ্যমে ১৮ লাখ টাকা দিয়ে ছেলেকে ইতালি পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু লিবিয়ায় পৌঁছানোর পর সেও দালালচক্রের হাতে জিম্মি হয়। এখন মুক্তিপণের দাবিতে তার ওপরও নির্যাতন চালানো হচ্ছে।
পরিবারগুলোর দাবি, দালালরা ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপে নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে দ্রুত টাকা পরিশোধের চাপ দিচ্ছে। ভিডিওতে যুবকদের আর্তচিৎকার ও নির্মম নির্যাতনের দৃশ্য দেখে পরিবারগুলোর সদস্যরা চরম মানসিক বিপর্যয়ের মধ্যে রয়েছেন।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, নির্যাতনের ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর অভিযুক্ত দালাল সামছুল আলম ও তার পরিবারের সদস্যরা গত ১০ থেকে ১২ দিন ধরে আত্মগোপনে রয়েছেন। অন্যদিকে লিবিয়ায় অবস্থানরত মূল দালাল মানিকের সঙ্গেও এখন আর কোনো যোগাযোগ করা যাচ্ছে না।
ছয় যুবককে জীবিত ও নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ইতোমধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে লিখিত আবেদন করেছে। একই সঙ্গে স্থানীয় সংসদ সদস্য, সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছে তারা।
এ বিষয়ে মনোহরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাকসুদ আহমেদ বলেন,এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, মানবপাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান চালিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি লিবিয়ায় জিম্মি থাকা ছয় যুবককে দ্রুত উদ্ধার করতে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।