অবক্ষয়ে নিপতিত পারিবারিক জীবন
- আপডেট সময় : ৮২ বার পড়া হয়েছে
সম্প্রতি সামাজিক অবক্ষয়ের কারনে পরিবারের খুব কাছের সদস্যের হাতে নির্মম ভাবে খুনের শিকার হচ্ছে নারী ও শিশু। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও জমি নিয়ে বিরোধ, অর্থনৈতিক চাপ, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, অনলাইন সম্পর্ক, মাদকাসক্তি, দাম্পত্য অবিশ্বাসের কারণে পরিবারেই ঘটছে খুনখারাবি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শারীরিক, মানসিক, যৌন ও অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকারের পাশাপাশি তাদের জীবন বিপন্ন হচ্ছে পরিবারের দ্বন্দ্বে। দাম্পত্য কলহে স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ বা বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কসহ মাদকের নেশায় নিজ পরিবারের কর্তা ব্যক্তির হাতে খুন হচ্ছে নারী-শিশুরা।
পুলিশ বলছে, দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের অভ্যন্তরে নানান অনিয়ম-বিবাহবহির্ভূত সম্পর্কের ঘটনা ঘটলেও তা থানা-পুলিশ পর্যন্ত আসে না। যে কারণে হত্যা বা ভয়াবহ নির্যাতনের পর মামলা হলে তদন্তে উঠে আসে দীর্ঘদিনের পারিবারিক বিরোধের তথ্য। তখন আর ঘটনা থামানোর সুযোগ থাকে না। এ প্রবণতায় খুনখারাবি বাড়ছে। এ ছাড়া পরিবারের ভেতরে দীর্ঘদিনের টানাপড়েন, সম্পর্কের অবনতি, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ, সন্দেহ, আর্থিক দ্বন্দ্ব ও মানসিক অস্থিরতার বিষয়টিও সামনে আসছে। এসব ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ছে নারী ও শিশুরা।
পারিবারিক সহিংসতায় শিশুরা কতটা অসহায়, গাজীপুরে তিন শিশুর মৃত্যু আবারও তা সামনে এনেছে। শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, পরিবারের ভেতরে সহিংসতা চললে শিশুরা দীর্ঘমেয়াদে ভয়, ট্রমা, উদ্বেগ ও আচরণগত সমস্যায় ভোগে। অনেক সময় তারাও সহিংসতার শিকার হয়। তারা বলছেন, দেশে শিশু সুরক্ষার আইনি কাঠামো থাকলেও পরিবারভিত্তিক সহিংসতা শনাক্ত ও প্রতিরোধে কার্যকর কমিউনিটি ব্যবস্থা দুর্বল।
চলতি বছরের প্রথম চার মাসের পুলিশ সদর দপ্তরের অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। জানুয়ারি থেকে এপ্রিলÑ এই চার মাসে সারা দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৫ হাজার ৯৫৮টি। একই সময়ে হত্যা মামলা হয়েছে ১ হাজার ১৪২টি। পুলিশ বলছে, এসব হত্যার বড় একটি অংশ পারিবারিক সহিংসতা, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, সম্পর্কগত সংকট কিংবা ঘরের ভেতরের বিরোধের সঙ্গে জড়িত।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি মাসে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ছিল ১ হাজার ২৮১টি। ফেব্রুয়ারিতে তা ১ হাজার ১৮১, মার্চে ১ হাজার ৪৮৫ এবং এপ্রিলে বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ১১টিতে। অর্থাৎ এপ্রিলেই সবচেয়ে বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা হয়েছে। একই সময়ে হত্যার সংখ্যাও উদ্বেগজনক। জানুয়ারিতে ২৮৭টি, ফেব্রুয়ারিতে ২৫০, মার্চে ৩১৭ এবং এপ্রিলে ২৮৮টি হত্যা মামলা রেকর্ড হয়েছে।
পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, শুধু নারী ও শিশু নির্যাতন নয়, অপহরণ, পুলিশ অ্যাসল্ট, চুরি, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধ, মাদক ও অন্যান্য অপরাধও ঊর্ধ্বমুখী। বিশেষ করে এপ্রিল মাসে মোট মামলা হয়েছে ১৭ হাজার ১৮০টি, যা চলতি বছরের প্রথম চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
সম্প্রতি গাজীপুরের কাপাসিয়ায় ভাড়া বাসার একটি কক্ষে পাশাপাশি পড়ে ছিল পাঁচটি মরদেহ। স্ত্রী, তিন শিশুসন্তান ও শ্যালককে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ফোরকান মিয়ার বিরুদ্ধে। প্রত্যেকের গলাকাটা লাশ, তার ওপর রাখা কম্পিউটারে টাইপ করা অভিযোগপত্র। সেখানে স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়া, টাকা আত্মসাৎ, নির্যাতনের অভিযোগ। আর ঘটনার পর থেকেই নিখোঁজ স্বামী ফোরকান মিয়া। এরই মধ্যে বগুড়া থেকে আসে আরেক বিভীষিকাময় খবর। সেখানে এক নবজাতককে গলা কেটে হত্যার পর পুকুরে ফেলে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে মা ও সৎবাবার বিরুদ্ধে। শনিবারের এসব ঘটনার আগে গত ২৪ এপ্রিল কুমিল্লার লালমাইয়ে নিজ সন্তানকে গলা কেটে হত্যা করেন বাবা।
তবে গত শনিবারের ঘটনাটিও তদন্তকারীদের হতবাক করেছে। নবজাতক শিশুকে গলা কেটে হত্যার পর পুকুরে ফেলে দেয় মা ও সৎবাবা। স্থানীয়রা বলছেন, শিশুটিকে পরিবারে অস্বস্তিকর উপস্থিতি হিসেবে দেখা হতো। কারণ শিশুটি ছিল ওই নারীর আগের স্বামীর। মাদকের টাকা না পেয়ে মোহাম্মদ উল্লাহ বাবাকে ঘরের দেয়ালে চেপে ধরে মারধর শুরু করে। একপর্যায়ে একটি ধারালো ছুরি নিয়ে বাবাকে হত্যা করতে ছুটে এলে বাবা উল্টো তাকে ধাক্কা দিলে বারান্দার মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে। এরপর ছেলের হাত থেকে ছুরি কেড়ে নিয়ে হিরণ মিয়া ছেলেকে হত্যা করেন।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, শিশুটির জন্মের পর থেকেই পারিবারিক দ্বন্দ্ব বাড়ছিল। তদন্তকারীরা খতিয়ে দেখছেন, আর্থিক অনিশ্চয়তা, সামাজিক চাপ, সম্পর্কগত জটিলতা কিংবা মানসিক অস্থিরতা এ হত্যার পেছনে কাজ করেছে কি না।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, দেশে সংঘটিত বহু হত্যাকাণ্ডই এখন আর পেশাদার অপরাধী চক্রের মাধ্যমে ঘটছে না। বরং ঘরের মানুষ, স্বামী, স্ত্রী, প্রেমিক, আত্মীয় কিংবা অভিভাবকের হাতেই ঘটছে ভয়ংকর সহিংসতা। গত কয়েক বছরে হত্যাকাণ্ডের বড় ট্রিগার হয়ে উঠেছে পারিবারিক কলহ, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, পরকীয়ার সন্দেহ, সন্তানের দায়ভার, সম্পত্তি, মাদক ও টাকার বিরোধ।
পুলিশ বলছে, পারিবারিক সহিংসতার অনেক ঘটনার পেছনেই মাদক বড় ভূমিকা রাখছে। ইয়াবা, গাঁজা, ফেনসিডিল ও আইস আসক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে হঠাৎ আক্রমণাত্মক আচরণ, সন্দেহপ্রবণতা এবং নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রবণতা দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে স্বামী মাদকাসক্ত, টাকা না পেলে স্ত্রী ও বাবা-মাকে মারধর করছে। আবার মাদক ব্যবসা বা আসক্তির কারণে পরিবারে আর্থিক সংকটও তৈরি হচ্ছে। সেখান থেকেও ঘটছে সহিংসতা।
পুলিশ সূত্র জানায়, পুলিশ সদর দপ্তরের চার মাসের পরিসংখ্যানে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হচ্ছে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলার ধারাবাহিক বৃদ্ধি। জানুয়ারিতে ১ হাজার ২৮১ থেকে এপ্রিলেই তা ২ হাজার ছাড়িয়েছে। এর নেপথ্য নিয়ে পুলিশ বলছে, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা বৃদ্ধি, অনলাইন ও অফলাইন যৌন হয়রানি, শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণ, দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, যৌতুক ও আর্থিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা, মাদকাসক্তি ও অপরাধপ্রবণতা।
পুলিশ আরও বলছে, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা শুধু সংখ্যায় বাড়ছে না, বরং সহিংসতার ধরনও আরও নৃশংস হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে হত্যার আগে দীর্ঘদিন শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ইতিহাস পাওয়া যাচ্ছে।
পুলিশের চার মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মাদক আইনে মামলা হয়েছে ১৮ হাজারেরও বেশি। জানুয়ারিতে ৪ হাজার ৯২২টি, ফেব্রুয়ারিতে ৩ হাজার ৩৫৯, মার্চে ৫ হাজার ৬২ এবং এপ্রিলে ৭ হাজার ২৯১টি মামলা হয়েছে। জানুয়ারিতে ডিএমপিতে মামলা ছিল ১ হাজার ৩৫২টি। ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ৪১, মার্চে ১ হাজার ৩০৫ ও এপ্রিলে ১ হাজার ৪৮৮টি মামলা হয়েছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএসএম শাহাদাত হোসেন বলেন, অনেক সময় সন্দেহ বাস্তব নয়, কিন্তু অভিযুক্ত ব্যক্তি তা সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক অপমানের ভয়, নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা এবং প্রতিশোধস্পৃহা। ফল হয় ভয়ংকর। সম্পর্কের মধ্যে আস্থাহীনতা যখন অসুস্থ পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তা সহিংসতা তৈরি করে। এতে নারী, শিশু এমনকি পরিবারের অন্য সদস্যরাও টার্গেটে পরিণত হন।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যার ঘনত্ব, অর্থনৈতিক বৈষম্য, মাদক, অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা রাজধানীতে পারিবারিক অপরাধ বাড়ার অন্যতম কারণ।
গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার বলেন, পারিবারিক সহিংসতার ঘটনায় স্থানীয়ভাবে মীমাংসার প্রবণতা অনেক বেশি। ফলে অনেক ঘটনা থানায় আসে না। কিন্তু দীর্ঘদিনের নির্যাতন পরে ভয়ংকর অপরাধে রূপ নেয়। তারা বলছেন, অনেক নারী নির্যাতনের পরও মামলা করেন না। পরে যখন খুন বা বড় সহিংসতা ঘটে, তখনই আগের নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসে।
এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পরিবারে কাউন্সেলিং ব্যবস্থা বাড়ানো, নারী ও শিশুর নিরাপদ অভিযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোরতা, কমিউনিটি নজরদারি, স্কুল পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, সম্পর্ক ও রাগ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। পারিবারিক সহিংসতাকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখার সংস্কৃতি বদলাতে হবে। কারণ ঘরের ভেতরের সহিংসতা একসময় ভয়ংকর অপরাধে রূপ নেয়, যার মূল্য দিতে হয় নারী ও শিশুদের। তিনি আরও বলেন, প্রযুক্তির অপব্যবহারও সম্পর্কগত সহিংসতা বাড়াচ্ছে। মোবাইল নজরদারি, ফেসবুক পাসওয়ার্ড নিয়ে দ্বন্দ্ব, অনলাইন সম্পর্ক, গোপন চ্যাট এসব বিষয় নিয়ে দাম্পত্য সংঘাত বাড়ছে। আবার অনেক পরিবারে একসঙ্গে বসবাস করলেও পারস্পরিক যোগাযোগ কমে গেছে। এতে মানসিক দূরত্ব বাড়ছে, যা ছোট বিরোধকে বড় সহিংসতায় রূপ দিচ্ছে।

















