ঢাকা ০৬:১৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬
সংবাদ শিরোনাম ::

আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামাত নেতাদের ‘শেল্টার’

লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্যে সিসিকের ফাইল গায়েব!

সিলেট প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ৩১ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

সিলেটে এক কুখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারীর অবৈধ অর্থ ও ক্ষমতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে আইনের তোয়াক্কা না করেই একের পর এক অপরাধ সাম্রাজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক মানবপাচার মামলার আসামি বশির আহমদ। তার নির্মিত অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবনের কারণে গত এক দশক ধরে চরম নিরাপত্তাহীনতা, মামলা, হামলা ও হুমকির মুখে দিন কাটাচ্ছেন সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এক অসহায় অফিস সহায়ক ও তার পরিবার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট মহানগরীর ২১নং ওয়ার্ডের শিবগঞ্জ লামাপাড়া মোহিনী (খন্ডিকরপাড়া) এলাকার বর্তমান বাসিন্দা বশির আহমদ (পিতা: মৃত আনসার আলী, মূল বাড়ি: দক্ষিণ সুরমার এনায়েত আলিপুর) ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬ সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে তার ‘নিশি মঞ্জিল’ নামক ভবনটি নির্মাণ করেছেন। ভবনটির উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশ অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে প্রতিবেশী ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অফিস সহায়ক জুবের আহমদ সাকুর বসতঘরের সীমানা প্রাচীরের ওপর তৈরি করা হয়েছে। সিসিক ২০২১ সালের ২৮ অক্টোবর ভবনটি পরিদর্শন করে নকশাবহির্ভূত নির্মাণের সত্যতা পায় এবং অবৈধ অংশ অপসারণের জন্য পর পর তিনবার নোটিশ প্রদান করে (স্মারক নং-১৪৬৬ ও ৫৯১ উল্লেখযোগ্য)। কিন্তু রহস্যজনক কারণে আজ পর্যন্ত কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বশির আহমদ ও তার ছেলেরা সাবেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুর রহমান আজাদ ও রঞ্জিত সরকারের সক্রিয় ক্যাডার হলেও, পট পরিবর্তনের পর বর্তমানে সিলেট মহানগর বিএনপি, তাঁতীদল ও জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে অর্থের বিনিময়ে হাত করে অপকর্মের শেল্টার নিচ্ছেন। অন্যদিকে, সিসিকের সহকারী প্রকৌশলী বেলাল আহমদ বশিরের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে ভুক্তভোগী জুবের আহমদের করা একাধিক আবেদন ও তদন্ত প্রতিবেদন ফাইল থেকে গায়েব করে দিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সিসিকের তৎকালীন ও বর্তমান কয়েকজন শীর্ষ প্রকৌশলী, ডিলিং সহকারী সাইফুল ও দীপক বাবুসহ একটি অসাধু সিন্ডিকেট এই ফাইল ধামাচাপা দেওয়ার পেছনে জড়িত বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী জুবের আহমদ সাকু জানান, অবৈধ ভবন নির্মাণে বাধা দেওয়ায় বশির ও তার চক্র উল্টো ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে সাকুর পরিবারের ওপর হামলা চালায়। বশির ও তার ছেলেদের বর্বর হামলায় সাকুর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর ৭ মাসের গর্ভপাতের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেও তৎকালীন শাহপরাণ থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। উল্টো সাকুর বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে পুলিশ ও পিবিআই (PBI) তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে এবং বশিরের জালিয়াতি ও সীমানা দখলের সত্যতা মিলেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে বশিরের ওই অবৈধ ও জরাজীর্ণ ভবনটি সাকুর বসতঘরের ওপর বিপজ্জনকভাবে হেলে পড়েছে। যেকোনো মুহূর্তে এটি ধসে পড়ে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। ভুক্তভোগী সাকু ইতিমধ্যে প্রধান উপদেষ্টা, দুদক ও সিলেটের জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বর্তমানে দুদকের অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে।
দক্ষিণ সুরমার প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চলের বাসিন্দা বশির ট্রাভেলস ব্যবসার আড়ালে আন্তর্জাতিক মানবপাচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ২০১৯ সালের মে মাসে অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় তার গ্রামের জিল্লুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন নিহত ও নিখোঁজ হন। লিবিয়ার ‘গেম ঘরে’ আটকে রেখে যুবকদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন ও পরিবার থেকে ১২ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে বশিরের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় মানবপাচার আইনে সুনির্দিষ্ট মামলা রয়েছে (মামলা নং-৩৩, তারিখ: ১৯/০৫/২০১৯), যা বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে।
উচ্ছেদে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে সিসিকের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবর জানান, “নতুন করে ফাইলটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেহেতু পিবিআই ও পুলিশের তদন্তে নকশা লঙ্ঘনের সত্যতা পাওয়া গেছে, তাই দ্রুতই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ অংশ উচ্ছেদ করা হবে।” সিসিকের বর্তমান প্রশাসক জানিয়েছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো প্রকৌশলী বা ডিলিং সহকারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামাত নেতাদের ‘শেল্টার’

লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্যে সিসিকের ফাইল গায়েব!

আপডেট সময় :

সিলেটে এক কুখ্যাত আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারীর অবৈধ অর্থ ও ক্ষমতার কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিরা। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের ‘ম্যানেজ’ করে আইনের তোয়াক্কা না করেই একের পর এক অপরাধ সাম্রাজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন আন্তর্জাতিক মানবপাচার মামলার আসামি বশির আহমদ। তার নির্মিত অবৈধ ও ঝুঁকিপূর্ণ বহুতল ভবনের কারণে গত এক দশক ধরে চরম নিরাপত্তাহীনতা, মামলা, হামলা ও হুমকির মুখে দিন কাটাচ্ছেন সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের এক অসহায় অফিস সহায়ক ও তার পরিবার।
অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট মহানগরীর ২১নং ওয়ার্ডের শিবগঞ্জ লামাপাড়া মোহিনী (খন্ডিকরপাড়া) এলাকার বর্তমান বাসিন্দা বশির আহমদ (পিতা: মৃত আনসার আলী, মূল বাড়ি: দক্ষিণ সুরমার এনায়েত আলিপুর) ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ১৯৯৬ সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে তার ‘নিশি মঞ্জিল’ নামক ভবনটি নির্মাণ করেছেন। ভবনটির উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমাংশ অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে প্রতিবেশী ও জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের অফিস সহায়ক জুবের আহমদ সাকুর বসতঘরের সীমানা প্রাচীরের ওপর তৈরি করা হয়েছে। সিসিক ২০২১ সালের ২৮ অক্টোবর ভবনটি পরিদর্শন করে নকশাবহির্ভূত নির্মাণের সত্যতা পায় এবং অবৈধ অংশ অপসারণের জন্য পর পর তিনবার নোটিশ প্রদান করে (স্মারক নং-১৪৬৬ ও ৫৯১ উল্লেখযোগ্য)। কিন্তু রহস্যজনক কারণে আজ পর্যন্ত কোনো উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, বশির আহমদ ও তার ছেলেরা সাবেক প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আজাদুর রহমান আজাদ ও রঞ্জিত সরকারের সক্রিয় ক্যাডার হলেও, পট পরিবর্তনের পর বর্তমানে সিলেট মহানগর বিএনপি, তাঁতীদল ও জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে অর্থের বিনিময়ে হাত করে অপকর্মের শেল্টার নিচ্ছেন। অন্যদিকে, সিসিকের সহকারী প্রকৌশলী বেলাল আহমদ বশিরের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে ভুক্তভোগী জুবের আহমদের করা একাধিক আবেদন ও তদন্ত প্রতিবেদন ফাইল থেকে গায়েব করে দিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। সিসিকের তৎকালীন ও বর্তমান কয়েকজন শীর্ষ প্রকৌশলী, ডিলিং সহকারী সাইফুল ও দীপক বাবুসহ একটি অসাধু সিন্ডিকেট এই ফাইল ধামাচাপা দেওয়ার পেছনে জড়িত বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী জুবের আহমদ সাকু জানান, অবৈধ ভবন নির্মাণে বাধা দেওয়ায় বশির ও তার চক্র উল্টো ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে সাকুর পরিবারের ওপর হামলা চালায়। বশির ও তার ছেলেদের বর্বর হামলায় সাকুর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীর ৭ মাসের গর্ভপাতের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটলেও তৎকালীন শাহপরাণ থানা পুলিশ মামলা নেয়নি। উল্টো সাকুর বিরুদ্ধে একের পর এক মিথ্যা চাঁদাবাজি মামলা দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে পুলিশ ও পিবিআই (PBI) তদন্তে মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে এবং বশিরের জালিয়াতি ও সীমানা দখলের সত্যতা মিলেছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক কয়েকটি ভূমিকম্পের ঝাঁকুনিতে বশিরের ওই অবৈধ ও জরাজীর্ণ ভবনটি সাকুর বসতঘরের ওপর বিপজ্জনকভাবে হেলে পড়েছে। যেকোনো মুহূর্তে এটি ধসে পড়ে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে। ভুক্তভোগী সাকু ইতিমধ্যে প্রধান উপদেষ্টা, দুদক ও সিলেটের জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। বর্তমানে দুদকের অভিযোগটি তদন্তাধীন রয়েছে।
দক্ষিণ সুরমার প্রত্যন্ত হাওর অঞ্চলের বাসিন্দা বশির ট্রাভেলস ব্যবসার আড়ালে আন্তর্জাতিক মানবপাচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। ২০১৯ সালের মে মাসে অবৈধ পথে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার পথে ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় তার গ্রামের জিল্লুর রহমানসহ বেশ কয়েকজন নিহত ও নিখোঁজ হন। লিবিয়ার ‘গেম ঘরে’ আটকে রেখে যুবকদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন ও পরিবার থেকে ১২ লাখ টাকা করে মুক্তিপণ আদায়ের অভিযোগে বশিরের বিরুদ্ধে কোতোয়ালী থানায় মানবপাচার আইনে সুনির্দিষ্ট মামলা রয়েছে (মামলা নং-৩৩, তারিখ: ১৯/০৫/২০১৯), যা বর্তমানে সিআইডি তদন্ত করছে।
উচ্ছেদে দীর্ঘসূত্রতার বিষয়ে সিসিকের বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী আলী আকবর জানান, “নতুন করে ফাইলটি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। যেহেতু পিবিআই ও পুলিশের তদন্তে নকশা লঙ্ঘনের সত্যতা পাওয়া গেছে, তাই দ্রুতই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অবৈধ অংশ উচ্ছেদ করা হবে।” সিসিকের বর্তমান প্রশাসক জানিয়েছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। কোনো প্রকৌশলী বা ডিলিং সহকারীর বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।