#ফ্যাসিবাদী শাসনে অভিযুক্তদের বিচার চায় দেশবাসী #নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলেই ব্যবস্থা
আগস্ট ঘিরে আ. লীগের প্রস্তুতি!
- আপডেট সময় : ১১৯ বার পড়া হয়েছে
২৪-এর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রায় দুই বছর পর আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে আওয়ামীলীগ। দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বর্তমানে আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিচ্ছিন্নভাবে ঝটিকা মিছিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়তা এবং তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগের কিছু আলামত দেখা যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে আগামী আগস্ট মাসকে কেন্দ্র করে দলটির ভেতরে নতুন পরিকল্পনা ও কৌশল নিয়ে আলোচনা চলছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
দলটির কেন্দ্রীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, আগস্টকে সামনে রেখে দেশের বাইরে অবস্থানরত কিছু নেতা-কর্মী দেশে ফেরার সম্ভাবনা ও পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছেন। তাদের মতে, বর্তমান আইনি অবস্থা, রাজনৈতিক পরিবেশ এবং আন্তর্জাতিক মহলের অবস্থান বিবেচনা করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে। এরই মধ্যে কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা-কর্মী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন এবং আরও অনেকে আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছেন।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা, সাবেক মন্ত্রী-এমপি, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং দল-সমর্থিত বিভিন্ন পর্যায়ের অনেক ব্যক্তি দেশত্যাগ করেন। পরবর্তীতে দলটির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরু হওয়া এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতায় রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ হওয়ার ফলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়ে। বর্তমানে আইন অনুযায়ী দলটির সভা-সমাবেশ, মিছিল, প্রচার-প্রচারণা এবং অনলাইনভিত্তিক রাজনৈতিক কার্যক্রমও নিষিদ্ধ রয়েছে। ২০২৬ সালে জাতীয় সংসদে সংশ্লিষ্ট আইন অনুমোদনের মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞা আরও শক্তিশালী আইনি ভিত্তি লাভ করে।
দলটির শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতা দেশের বাইরে অবস্থান করলেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতা-কর্মী এখনও দেশে রয়েছেন বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন এবং দলের ভবিষ্যৎ কৌশলগত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের জন্য আগস্ট মাস ঐতিহাসিক, আবেগিক ও রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দলটির প্রতিষ্ঠাতা নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের শাহাদাতবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে অতীতে দলটি ব্যাপক কর্মসূচি পালন করে এসেছে। ফলে আগস্টকে ঘিরে দলটির ভেতরে নতুন করে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ শুরু হওয়া অস্বাভাবিক নয়।
দলীয় সূত্রগুলোর দাবি, আগস্টকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ দেশের অভ্যন্তরে নিজেদের সাংগঠনিক সক্ষমতা ও যোগাযোগব্যবস্থা কতটা কার্যকর রয়েছে, তা মূল্যায়ন করতে চায়। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দলটির অবস্থান, নিষেধাজ্ঞা এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা জোরদারেরও চেষ্টা চলছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মহল ও ফোরামের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও সংশ্লিষ্ট নেতাদের কেউ কেউ দাবি করেছেন।
আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা অনানুষ্ঠানিকভাবে বলছেন, রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অস্তিত্ব পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব নয়। তাদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দলীয় কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এখনো পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়নি এবং সুযোগ সৃষ্টি হলে সাংগঠনিক পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। তবে বর্তমান আইনি বাস্তবতার কারণে অধিকাংশ নেতা প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করতে আগ্রহী নন। তাদের আশঙ্কা, দলীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগে নতুন মামলা বা গ্রেপ্তারের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে সরকারের অবস্থানও স্পষ্ট। সরকার একাধিকবার জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার আগে কোনো ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে জনগণের যে অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন। তাদের দাবি, দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদী শাসনের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচার চায়। তারা আরও বলেন, কোনো ধরনের অস্থিতিশীলতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা হলে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তা প্রতিহত করা হবে। বিএনপি নেতাদের মতে, আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং বিদ্যমান আইনের প্রয়োগ। ফলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে কোনো ধরনের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারাও বলছেন, নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার যেকোনো প্রচেষ্টা নজরদারির আওতায় রাখা হচ্ছে। বিভিন্ন জেলায় আকস্মিক মিছিল বা সমাবেশের ঘটনায় ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নয়; বরং আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের ভিত্তিতেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সামনে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ আইনি অনিশ্চয়তা। দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করছে আদালতের সিদ্ধান্ত এবং চলমান বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর। ফলে মাঠের রাজনৈতিক কর্মসূচির তুলনায় আইনি ও কূটনৈতিক তৎপরতাই এখন দলটির প্রধান কৌশল হয়ে উঠতে পারে। তাদের মতে, আওয়ামী লীগের একটি উল্লেখযোগ্য জনসমর্থন এখনও পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায়নি। তবে সাংগঠনিক পুনরুত্থানের পথে দলটিকে আইনি বাধা, নেতৃত্বের সংকট, রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং জনমতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর মোকাবিলা করতে হবে।
আগস্টকে কেন্দ্র করে দলটির অভ্যন্তরে নতুন আলোচনা শুরু হলেও ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো চিত্র সামনে আসেনি। একদিকে বিচারিক প্রক্রিয়া, অন্যদিকে রাজনৈতিক বাস্তবতা-এই দুইয়ের সমন্বয়েই নির্ধারিত হবে দলটির পরবর্তী পথচলা।
তবে একটি বিষয়ে রাজনৈতিক মহলের অনেকের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে-বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ প্রশ্নটি এখনো পুরোপুরি সমাপ্ত হয়নি। আগস্ট মাসকে ঘিরে দলটির সম্ভাব্য পদক্ষেপ, সরকারের প্রতিক্রিয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান আগামী দিনগুলোতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা জন্ম দিতে পারে।

















