বেড়েই চলছে আক্রান্তের হার, বেশী ঝুঁকিতে শিশুরা
দেশজুড়ে হাম আতঙ্ক
- আপডেট সময় : ৩৬ বার পড়া হয়েছে
ঢাকাসহ সারা দেশে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় অনেক স্থানে শয্যা সংকটও দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দেশের সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড বা কেবিন চালু বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। একই সঙ্গে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও রোগীদের কার্যকর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে জারি করা হয়েছে পাঁচ দফা বিশেষ নির্দেশনা। গতকাল মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) মঈনুল আহসান স্বাক্ষরিত নির্দেশনায় বলা হয়েছে, সরকারি সব স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানকে হাম ও সন্দেহজনক হাম রোগীদের জন্য পৃথক ওয়ার্ড চালু করতে হবে। আক্রান্ত রোগীদের দ্রুত ভর্তি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিতেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্যে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশে হাম ও হামের উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মারা গেছে ২ শিশু এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৯ জন। একই সময়ে নতুন আক্রান্ত হয়েছে ১ হাজার ৩৩৭ জন। গত দুই মাসে হাম ও হামের উপসর্গে সারা দেশে মোট ৪৭৫ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৭৭ শিশুর এবং উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৩৯৮ শিশু।
রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, শিশু ওয়ার্ডগুলোতে রোগীর চাপ স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট নিয়ে প্রতিদিন শত শত শিশু হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। অনেক অভিভাবক সন্তানকে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন চিকিৎসকের জন্য। কোথাও কোথাও একটি বেডে একাধিক রোগীকেও চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
ঢাকার একটি সরকারি হাসপাতালের শিশু বিভাগের এক চিকিৎসক বলেন, বর্তমানে যে হারে হাম রোগী আসছে, তা গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। বেশিরভাগ শিশুই টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকা নেওয়া। অনেকেই দেরিতে হাসপাতালে আসছে, ফলে জটিলতা বাড়ছে।
চিকিৎসকদের মতে, হাম সাধারণ ভাইরাসজনিত রোগ হলেও অপুষ্টি ও টিকা না নেওয়া শিশুদের ক্ষেত্রে এটি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, চোখের সংক্রমণ এবং শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতায় অনেক শিশুর অবস্থা দ্রুত সংকটাপন্ন হয়ে পড়ছে।
রাজধানীর এক বেসরকারি হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ জানান, শুরুতে অনেকে সাধারণ জ্বর বা ঠান্ডা ভেবে গুরুত্ব দিচ্ছেন না। পরে শরীরে র্যাশ দেখা দিলে হাসপাতালে আসছেন। ততক্ষণে সংক্রমণ অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ছে।
শুধু রাজধানী নয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শিশু রোগীর চাপ সামাল দিতে অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। কয়েকটি হাসপাতালে হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা কর্নার চালু করা হয়েছে।
হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুর মা বলেন, প্রথমে জ্বর হয়েছিল। পরে শরীরে দানা ওঠে। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা করিয়েও ভালো হয়নি। এখন হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। খুব ভয় লাগছে।
আরেক অভিভাবক অভিযোগ করেন, গ্রামের অনেক মানুষ এখনও হামকে সাধারণ রোগ মনে করেন। টিকার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাবও রয়েছে। ফলে শিশুদের ঝুঁকি বাড়ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) দীর্ঘদিন সফল থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে টিকাগ্রহণে অনীহা, সচেতনতার ঘাটতি এবং কিছু এলাকায় টিকার আওতা কমে যাওয়ায় হাম আবারও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় অনেক শিশু নির্ধারিত টিকা থেকে বাদ পড়েছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই জরুরি ভিত্তিতে দেশব্যাপী বিশেষ টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা না করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। পাশাপাশি স্কুল, মাদরাসা ও জনসমাগমস্থলে সচেতনতামূলক প্রচার বাড়ানোরও তাগিদ দিয়েছেন তারা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাসপাতালগুলোকে পৃথক ওয়ার্ড চালুর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় ওষুধ, সুরক্ষা সামগ্রী ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা জোরদারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সংক্রমণ রোধে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদেরও বাড়তি সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সময়মতো টিকা গ্রহণ। শিশুর জ্বর, চোখ লাল হওয়া, কাশি এবং শরীরে লালচে দানা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ক্রমেই বাড়তে থাকা সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে। স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।



















