না’গঞ্জে সাত খুন মামলা
আটক আছে আপিলে, রায় কার্যকর হয়নি ২ বছরেও
- আপডেট সময় : ১৯ বার পড়া হয়েছে
নারায়ণগঞ্জের বহুল আলোচিত সাত খুনের ঘটনার এক যুগ পূর্ণ হয়েছে গতকাল সোমবার। দীর্ঘ ১২ বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার চূড়ান্ত রায় এখনও কার্যকর হয়নি। দেশের বিচার ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও প্রভাবশালী আসামিদের কারণে বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এমন অভিযোগে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে নিহতদের পরিবারগুলোর মধ্যে।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল, নারায়ণগঞ্জ আদালতে হাজিরা শেষে ফেরার পথে অপহৃত হন তৎকালীন সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকার, নজরুলের সহযোগী তাজুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, মনিরুজ্জামান স্বপন, স্বপনের গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম এবং আইনজীবী চন্দনের গাড়িচালক ইব্রাহিম। ঘটনার তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একে একে ভেসে ওঠে তাদের মরদেহ, যা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
এ ঘটনায় ফতুল্লা থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি এবং আইনজীবী চন্দন সরকারের জামাতা বিজয় কুমার পাল। দীর্ঘ তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি আদালত রায় ঘোষণা করেন। এতে প্রধান আসামি নূর হোসেন এবং র্যাব কর্মকর্তা তারেক সাঈদ মোহাম্মদসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে ২০১৮ সালে উচ্চ আদালত ১৫ জনের মৃত্যুদ-বহাল রাখেন এবং অন্য আসামিদের সাজাও আংশিক বহাল বা পরিবর্তন করেন। তবে এরপর থেকেই মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে শুনানির অপেক্ষায় পড়ে আছে। প্রায় আট বছর ধরে আপিল নিষ্পত্তি না হওয়ায় চূড়ান্ত বিচার কার্যকর হচ্ছে না।
নিহতদের স্বজনদের অভিযোগ, আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়া ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করা হচ্ছে। নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বলেন, এই মামলার জন্য আমরা অনেক লড়াই করেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তাদের সঙ্গে আমরা আর পারছি না। না হলে মামলাটি এভাবে ঝুলে থাকবে কেন? এখানে তো সবকিছুই প্রমাণিত।
একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেন নিহত তাজুল ইসলামের ভাই রাজু আহমদ। তিনি বলেন, কী অদৃশ্য শক্তির কারণে প্রায় আট বছর ধরে মামলাটি আপিল বিভাগে ঝুলে আছে, তা আমরা জানি না। তবে আমরা মনে করি, আসামিরা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করছে। আইনজীবীদের একটি অংশও একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানাচ্ছেন। তাদের মতে, সাজাপ্রাপ্তদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বিচারপ্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলেছে। ফলে একটি বহুল আলোচিত ও স্পর্শকাতর মামলার রায় কার্যকর না হওয়ায় বিচারব্যবস্থার ওপর জনসাধারণের আস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
বাদী পক্ষের আইনজীবী সাখাওয়াত হোসেন খাঁন জানান, সরকার পরিবর্তনের পর মামলাটির অগ্রগতির বিষয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, আমরা ইতিমধ্যে উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টা করছি, যাতে আপিল দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। আশা করছি, শিগগিরই আসামিদের সাজা কার্যকর করা সম্ভব হবে।
মানবাধিকারকর্মীরাও বিষয়টিকে বিচারহীনতার সংস্কৃতির একটি উদাহরণ হিসেবে দেখছেন। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের ঢাকা বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও হতাশাজনক। একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ডের বিচার এত দীর্ঘ সময় ঝুলে থাকা বিচার বিভাগের বড় ধরনের ব্যর্থতা নির্দেশ করে। আইনের শাসন থাকলে এমনটি হওয়ার কথা নয়।
সচেতন নাগরিকদের মতে, এই মামলাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়, বরং দেশের আইনশৃঙ্খলা ও বিচারব্যবস্থার সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাও। দীর্ঘসূত্রতার কারণে যদি এই মামলার রায় কার্যকর না হয়, তবে তা ভবিষ্যতে অপরাধীদের জন্য এক ধরনের বার্তা তৈরি করতে পারে-যেখানে প্রভাব থাকলে বিচার এড়ানো সম্ভব।






















