আতঙ্কের নাম বজ্রপাত
- আপডেট সময় : ২৬ বার পড়া হয়েছে
বজ্রপাতে নিহতের লাশ দাফনের পর থেকেই প্রতিরাতে লাশ চুরির শঙ্কায় কবর পাহারা দেন নিহতের বাবা ও তার লোকজন। কবরের নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা থেকে এমন উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানায় তার পরিবার। মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি এলাকায় বজ্রপাতে মারা যান আরাফাত নামের এক যুবক। আরাফাতের বাবা জসিম খান বলেন, আমার ছেলে দর্জির কাজ করে সংসার চালাতো। গরুর জন্য ঘাস আনতে গিয়ে বজ্রপাতে তার মৃত্যু হয়। অনেকের মুখে শুনেছি, বজ্রপাতে মারা যাওয়া ব্যক্তিদেরলাশচুরি হয়। সেই ভয় থেকেই কবর পাহারা দিচ্ছি।
তিনি বলেন, আমি অসুস্থ মানুষ, সবসময় থাকতে পারি না। ঋণ করে লোক রেখে কবর পাহারা দিতে হচ্ছে। নিজের সংসারই ঠিকমতো চালাতে পারছি না, তবুও ছেলের কবর রক্ষায় প্রতিদিন খরচ করতে হচ্ছে। প্রশাসন যদি কবর পাহারার ব্যবস্থা করত, তাহলে কিছুটা শান্তি পেতাম। কিছু দুষ্কৃতকারী আমাদের এলাকা থেকে প্রায়ই লাশ চুরি করে নিচ্ছে। বজ্রপাতে মারা গেলে ওই মরদেহের দাম নাকি অনেক বেশি। যার কারণে পরিবারটি রাত জেগে তাদের সন্তানেরলাশপাহারা দিচ্ছে। আমরা স্থানীয় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। পাশাপাশি কবরস্থানের নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানাচ্ছি, যাতে সদ্য সন্তান হারানো পরিবারটি এমন মানসিক চাপ থেকে মুক্তি পায়।
শুধু তাই নয়, সুনামগঞ্জের মধ্যনগর থানার মির্জাপুর গ্রামের একটি ঘটনার আতঙ্কের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। সেখানে রুপালি নামের এক নারী জানান, প্রায় ১৮ বছর আগে তার স্বামী বিলে মাছ ধরতে গিয়ে বজ্রপাতে মারা যান। তখন থেকেই তিনি আতঙ্কে ছিলেন যেলাশচুরি হয়ে যেতে পারে। সেই ভয়ে তারা স্বামীর দেহ কবরস্থানে না রেখে বাড়ির কাছেই দাফন করেন। এ ধরনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। বিভিন্ন সময় নাটোর, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও শেরপুরসহ বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে নিহতদের লাশ পাহারা দেওয়া বা বাড়ির ভেতরে কবর দেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এমন পরিস্থিতে বজ্রপাতে মৃতদেহ চুরি নিয়ে এই কুসংস্কার শুধু ব্যক্তিগত ভয় তৈরি করছে না, বরং সামাজিক আচরণেও প্রভাব ফেলছে। অনেক পরিবার কবর দেওয়ার পর রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার কবর সিমেন্ট দিয়ে পাকা করে ফেলার ঘটনাও ঘটছে। এ ধরনের আচরণ শুধু অযৌক্তিকই নয়, বরং শোকাহত পরিবারের ওপর বাড়তি মানসিক চাপ তৈরি করছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই আতঙ্ক দূর করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন সচেতনতা বৃদ্ধি।
বজ্রপাতে নিহতদের লাশ চুরি নিয়ে আতঙ্ক মূলত বাস্তবতার চেয়ে কুসংস্কার ও গুজবনির্ভর এক মানসিক নির্মাণ। বিজ্ঞান বলছে, এসব মরদেহের কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্য নেই, যা চুরি বা ব্যবহারের যোগ্য হতে পারে। তবুও দীর্ঘদিনের অন্ধবিশ্বাস, গ্রামীণ সংস্কৃতির প্রভাব এবং সচেতনতার অভাবে এই ভয় এখনো সমাজে টিকে আছে।
দেশে বজ্রপাত এখন আর শুধু একটি মৌসুমি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, বরং গ্রামীণ জীবনে এক ধরনের সামাজিক আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বজ্রপাতে নিহত ব্যক্তিদেরলাশঘিরে চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা বহু এলাকায় এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, অনেক পরিবার কবর দেওয়ার পরও রাত জেগে পাহারা দিচ্ছে। কোথাও কোথাও আবার মৃতদেহ বাড়ির আঙিনায় বা গরুর ঘরের পাশে কবর দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। প্রশ্ন উঠছে একটি মরদেহকে ঘিরে এই অস্বাভাবিক আতঙ্ক কেন তৈরি হচ্ছে?
বজ্রপাতে নিহতদের লাশ চুরি নিয়ে আতঙ্কের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসে দীর্ঘদিনের কুসংস্কার। গ্রামীণ সমাজে একটি ধারণা প্রচলিত আছে। বজ্রপাতে মৃত্যুবরণ করা মানুষের শরীর বিশেষ শক্তি বা মূল্যবান উপাদানে রূপান্তরিত হয়। কেউ কেউ মনে করেন, এ ধরনের মরদেহে প্রাকৃতিক চুম্বকীয় গুণ তৈরি হয়, আবার অনেকে বিশ্বাস করেন, এসব মৃতদেহের হাড়-গোড় জাদুবিদ্যা বা অলৌকিক সাধনায় ব্যবহৃত হতে পারে। এই বিশ্বাসের কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই, তবুও প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তা টিকে আছে। ফলে বজ্রপাতে কেউ মারা গেলে অনেক পরিবারইলাশদ্রুত দাফন করলেও স্বস্তিতে থাকতে পারে না।
তবে গ্রামীণ সমাজে এই সহজ সত্যটি বহু ক্ষেত্রে পৌঁছায়নি। বিশেষ করে শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবে নানা ধরনের গল্প ও গুজবই বেশি প্রভাব ফেলেছে। কেউ কেউ আবার বিশ্বাস করেন, বজ্রপাতে মৃত মানুষের দেহ চুম্বকের মতো কাজ করে, ফলে মূল্যবান ধাতু আকর্ষণ করতে পারে। এই ধরনের ভুল ধারণা থেকেইলাশচুরির ভয় তৈরি হয়। বিষয়টি ষোল আনাই গুজব এবং কুসংস্কার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশে বজ্রপাতের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রাইমস (রিজিওনাল ইন্টিগ্রেটেড মাল্টি হ্যাজার্ড আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম)-এর তথ্য অনুযায়ী দেশে বছরে প্রায় ৩.৩৬ মিলিয়ন বজ্রপাত ঘটে। এর মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও সিলেট।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হওয়ার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে দূষণেরও সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা। তাদের মতে, গরম বাড়ার ফলে বায়ুম-লে অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে, যা বজ্রপাতের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের অভাবই এই ধরনের কুসংস্কারকে দীর্ঘদিন ধরে টিকিয়ে রেখেছে। গ্রামীণ এলাকায় স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক সচেতনতা না থাকায় গুজব সহজেই মানুষের বিশ্বাসে পরিণত হয়। ফলে বজ্রপাতে মৃত্যুর মতো একটি প্রাকৃতিক ঘটনা সামাজিক আতঙ্কে রূপ নিচ্ছে। আর সেই আতঙ্ক থেকেই তৈরি হচ্ছে মৃতদেহ চুরির ভয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের কুসংস্কার দূর করতে হলে বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষা, গণমাধ্যমের সচেতন ভূমিকা এবং স্থানীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক প্রচার-প্রচারণা জরুরি। না হলে বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ শুধু প্রাণহানিই ঘটাবে না, বরং সমাজে অযৌক্তিক আতঙ্ককেও আরও গভীর করে তুলবে। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরাও একই কথা বলছেন। তাদের মতে, মৃতদেহের কোনো বৈজ্ঞানিক বা চিকিৎসাগত মূল্য নেই যা চুরি করে ব্যবহার করা যায়। তবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের সাবেক সহযোগী অধ্যাপক ডা. সোহেল মাহমুদের মতে, এটি সম্পূর্ণ অন্ধবিশ্বাস। তিনি বলেন,বজ্রপাতে মৃত্যু আর সাধারণ বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মৃত্যু দুটিই শারীরিকভাবে একই ধরনের। এর মধ্যে কোনো ধরনের ধাতব বা চুম্বকীয় পরিবর্তন ঘটে না। বৈজ্ঞানিকভাবে বজ্রপাত হলো মেঘে জমা বিদ্যুতের আকস্মিক নির্গমন। যখন কোনো মানুষ বা প্রাণী এতে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, তখন শরীরে বৈদ্যুতিক আঘাতজনিত ক্ষতি হয়, কিন্তু কোনো বিশেষ পদার্থ তৈরি হয় না।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, বজ্রপাতে মৃতদেহ চুরি হওয়ার পেছনে কোনো বাস্তব বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু অসাধু ব্যক্তি ও গ্রাম্য ওঝা-কবিরাজদের একটি চক্র এসব কুসংস্কারকে ব্যবহার করে বিভ্রান্তি তৈরি করে থাকে। তাদের মতে, বজ্রপাতে মৃতদেহ অনেক কাজে লাগে, এমন ভুয়া বিশ্বাস থেকেই কিছু মানুষ লাশ চুরির চেষ্টা করে। বাস্তবে এগুলো সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ধারণা। এ ধরনের ঘটনায় কেউ অভিযোগ করলে পুলিশ ব্যবস্থা নেয়।
এদিকে সচেতনতার অংশ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা জানান,বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর অন্যতম কারণ হলো খোলা জায়গায় মানুষের উপস্থিতি। কৃষক, জেলে বা মাঠে কাজ করা মানুষরা ঝড়ের সময়ও বাইরে থাকেন, ফলে ঝুঁকি বেড়ে যায়। এছাড়া অনেক এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ের অভাব এবং বজ্রপাত সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতনতার ঘাটতিও বড় কারণ হিসেবে দেখা হয়।
বজ্রপাতের সময় কী করা উচিৎ, তা নিয়ে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নির্দেশনায় বলা হয়েছে, বজ্রপাতের সময় সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হলো ঘরের ভেতর থাকা। খোলা মাঠ, জলাশয় বা উঁচু গাছের নিচে আশ্রয় নেওয়া বিপজ্জনক। অনেক ক্ষেত্রে বজ্রপাত কাছাকাছি আঘাত করলেও বৈদ্যুতিক প্রবাহ মাটির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যা আশপাশে থাকা মানুষকেও ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অতি জরুরি প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যেতে হলে রাবারের জুতা পরে যেতে হবে।
এছাড়া বজ্রপাতের সময় ধানক্ষেত বা খোলামাঠে যদি থাকেন তাহলে পায়ের আঙুলের ওপর ভর দিয়ে এবং কানে আঙুল দিয়ে নিচু হয়ে বসে পড়তে হবে। বজ্রপাতের আশংকা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব দালান বা কংক্রিটের ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। ভবনের ছাদে বা উঁচু ভূমিতে যাওয়া উচিত হবে না। খালি জায়গায় যদি উঁচু গাছপালা, বৈদ্যুতিক খুঁটি, ধাতব পদার্থ বা মোবাইল টাওয়ার থাকে, তার কাছাকাছি থাকা যাবে না। বজ্রপাতের সময় ছাউনিবিহীন নৌকায় মাছ ধরতে না যাওয়াই উচিত হবে। সমুদ্রে বা নদীতে থাকলে মাছ ধরা বন্ধ রেখে নৌকার ছাউনির নিচে আশ্রয় নিতে হবে। যদি কেউ গাড়ির ভেতরে থাকে, তবে গাড়ির ধাতব অংশের সাথে শরীরের সংযোগ রাখা যাবে না। আর বজ্রপাতে আহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে না, তাই দ্রুত তাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে এনে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।
বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মাঝে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মারা গেছে মোট তিন হাজার ৬৫৮ জন। বজ্রপাতে মৃত্যুর সেই পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত এক দশকে এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে ওঠানামা করেছে এবং একটি সময় পর্যন্ত এর প্রবণতা ছিল ঊর্ধ্বমুখী। এর মাঝে ২০১৫ সালে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ২২৬ জন। পরের বছর ২০১৬ সালে এটি বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯১ জনে। ২০১৭ সালে কিছুটা কমে ৩৮৮ জন হলেও ২০১৮ সালে আরও কমে ৩৫৯ জনে নেমে আসে। এরপর ২০১৯ সালে আবার বৃদ্ধি পেয়ে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪০১ জনে এবং ২০২০ সালে সর্বোচ্চ ৪২৭ জনে পৌঁছায়। অর্থাৎ, এই সময়টিতে বজ্রপাতজনিত মৃত্যু উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। তবে ২০২১ সাল থেকে ধীরে ধীরে বজ্রপাতে মৃত্যু কমার প্রবণতা দেখা যায়। ওই বছর ৩৬৩ জন, ২০২২ সালে ৩৩৭ জন এবং ২০২৩ সালে ৩২২ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৪ সালে এটি আরও কমে ২৭১ জনে নেমে আসে এবং ২০২৫ সালে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে দাঁড়ায় ১৭৩ জনে।
আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক এ প্রসঙ্গে গনমাধ্যমকে বলেন, চলতি বছরেও এখন পর্যন্ত বজ্রপাতে ২৮ থেকে ৩০ জন মানুষ মারা গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে সামগ্রিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০ সালের পর থেকে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে। এর পেছনে ‘২০১৯-২০২০ সাল থেকে বজ্রপাতের দুই- চার ঘণ্টা আগে আবহাওয়া অধিদপ্তর থেকে দেওয়া আগাম সতর্কতা, সামাজিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম বাড়ানো ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন মল্লিক।



















