কষ্ট, তবুও আশার আলো
- আপডেট সময় : ২৩ বার পড়া হয়েছে
বিএনপির কেন্দ্রীয় অনেক ত্যাগী শীর্ষ নেতা আবারো সাংগঠনিক কার্যাক্রমে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। উপযুক্ত মূল্যায়ন না পেয়ে ত্যাগীরা তাদের দলীয় তীর্থস্থান নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এসে কষ্টের পাথর সরানোর চেষ্টা করছেন। বিগত বছর জেল জুলুম, নির্যাতন মামলা হামলায় আহত হয়ে কারাগারে এবং হাসপাতালে থেকে আন্দোলন করেছেন। আজ তাদেরকে দুরে ঠেলে দিয়ে শীতের পাখীর মতো আসা কিছু নেতা মন্ত্রী-এমপি হয়েছেন। ত্যাগীদের কোথাও তেমন ঠাই হচ্ছে না। তারা আগের মতোই ভালোবাসার জায়গা নয়াপল্টনের দলীয় কার্যালয়ের সামনে আসছেন। প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত তারা সেখানে মনের অব্যক্ত বেদনা নিয়ে একে অপরকে শেয়ার করেন। তাদের মতে শেয়ার করলে তাদের মনের চাপ হালকা হয়।
গত দু’সপ্তাহ যাবত তাদেরকে আগের মতোই সক্রিয় হতে দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে গত দু’সপ্তাহ আগ থেকে দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের মনোনয়ন বিক্রিকে কেন্দ্র করে ত্যাগীদের এই সক্রিয়তা দেখা গেছে বেশ লক্ষণীয়ভাবে। এর মধ্যে অন্যতম নেতা হচ্ছেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ।
ত্যাগী নেতাকর্মীদের দেয়া তথ্য মতে, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। আন্দোলন জোরালো করতে নেতাকর্মীদের নানাভাবে উৎসাহ দিয়েছেন এই নেতা। পিকেটিংসহ প্রতিটি মিছিল, মিটিংয়ে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। বেশ কয়েকবার রাজপথ থেকে গ্রেপ্তারও হন। রিমান্ডে তার ওপর চলে অমানবিক নির্যাতন। রাত কাটিয়েছেন কারাগারের অন্ধকারে। একদিকে রিমান্ডে নির্যাতন, অন্যদিকে কারাগারে বিনা চিকিৎসায় তার একটি কিডনি অকেজো হলে ফেলে দেয়া হয়।
২০০১ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি মালিবাগে হরতাল চলাকালে বিএনপির শান্তিপূর্ণ মিছিলে আওয়ামী সন্ত্রাসীদের গুলিতে ৪ জন নিহত হন। ওই সময় মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল গুলিবিদ্ধ হন। তার মেরুদণ্ডে দুবার অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। এখনো বয়ে বেড়াচ্ছেন গুলির সেই ক্ষত। মায়ের মৃত্যুর সময় ছিলেন কারাগারে। মৃত্যুর ৩ দিন পর ৮ ঘণ্টা প্যারোলে রংপুর থেকে বরিশালে নেয়া হলেও মায়ের মুখ আর দেখতে পারেননি তিনি। আলালের সাড়ে ৩ বছর সাজার রায় দেয়া হয়। এমন পরিস্থিতিতেও কারাগার থেকে তিনি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার নানা বার্তা দিতেন নেতাকর্মীদের। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তাকেও এমপি, মন্ত্রী কিংবা দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে চেয়েছেন নেতারা। এত ত্যাগের পরও তাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি বলে অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ।
এছাড়া সম্প্রতি বিএনপি কর্তৃক ১ মে দিবস পালন করাকে কেন্দ্র করে দলটি নানা ধরনের কর্মসূচি গ্রহণ করে। এর মধ্যে সক্রিয় হয়েছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানসহ অনেকেই। এদের মধ্যে মধ্যম সারির নেতারা হচ্ছেন, বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মীর সরাফত আলী সপু, সহ-দপ্তর সম্পাদক মনির হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, কৃষক দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল রহমান টিপু, জাসাসের সভাপতি হেলাল খান, সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন রোকন, তাঁতী দলের সভাপতি আবুল কালাম আজাদ, সদস্য সচিব মজিবুর রহমান, উলামা দলের সভাপতি কাজী সেলিম রেজা, সদস্য সদস্য আবুল হোসেন, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুল করীম মজুমদার, প্রচার সম্পাদক মনজুরুল ইসলাম মনজু।
এদিকে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বদলে ক্ষমতায় এসেছে বিএনপি। কিন্তু অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীর অভিযোগ, তাদের ভাগ্য বদলায়নি। বরং বঞ্চনার কথাই বেশি শোনা যাচ্ছে। ত্যাগ আছে, কিন্তু মূল্যায়ন কোথায়? এই প্রশ্ন এখন দলটির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাদের মুখে মুখে। তারা বলছেন, রাজনীতি করলে কিছু ভুলভ্রান্তি হতে পারে। কিন্তু অনেক নেতাই আছেন, যাদের বিএনপির হেভিওয়েট বলে মনে করা হয়। ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আবদুল মঈন খান, রুহুল কবীর রিজভীসহ এমন অনেকেই আছেন-যারা বিগত দেড় যুগ দলকে আগলে রেখেছেন। ক্রশিয়াল সময়ে লড়াই করেছেন। তাদের কাউকে কাউকে শেখ হাসিনা সরকার নানা প্রলোভন দিয়ে নির্বাচনে নেয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। অনেকের মতে, ত্যাগী এসব নেতার যথাযথ মূল্যায়ন করা হয়নি। বরং এমন অনেকে মন্ত্রিসভায় স্থান পেয়েছেন, যাদের নাম অনেক বছর ধরে শোনা যায়নি।
২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরে প্রায় দেড় লাখ মামলায় ৬০ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে বলে দাবি বিএনপির। কারও কারও বিরুদ্ধে জমেছে মামলার পাহাড়। অনেকেই আক্ষেপ করে বলছেন, আন্দোলনের সময় যাদের খুঁজে পাওয়া যায়নি, তারাই এখন প্রভাবশালী। আর যারা জীবনবাজি রেখে রাজপথে ছিলেন, তারা অবহেলিত। কেউ কেউ সরাসরি দলের কাছে ত্যাগের স্বীকৃতি দাবি করছেন। তাদের মতে, শুধু ক্ষমতায় আসাই শেষ কথা নয়, যারা এই পথ তৈরি করেছেন, তাদের মূল্যায়ন না হলে দলীয় ঐক্য ও ভবিষ্যৎ রাজনীতি হুমকির মুখে পড়তে পারে।
বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবীর রিজভীকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হলেও এ নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া আছে বিএনপির রাজনীতিতে। হাসিনাবিরোধী আন্দোলনের কঠিন সময়ে এমন অনেকদিন ছিল, দলীয় কার্যালয়ে ঝড়ের বেগে প্রেস ব্রিফিং করে আবারও আত্মগোপনে যেতে হয়েছে রিজভীকে। কারণ, দলের বেশির ভাগ নেতা তখন গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন। কিন্তু মন্ত্রিত্বের বদলে রিজভীকে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করায় অনেকে বিস্মিত হয়েছেন। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেলও এই বাস্তবতার একটি উদাহরণ। সাড়ে চারশ মামলার আসামি হিসাবে দীর্ঘ সময় আদালত ও কারাগারে কাটিয়েছেন তিনি। প্রতিটি আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। তার অনুসারীদের প্রত্যাশা ছিল, গণঅভ্যুত্থানের পর তিনি এমপি, মন্ত্রী, মেয়র কিংবা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে মূল্যায়িত হবেন। তবে কোনোটিই ঘটেনি।
বিএনপি নেতা আলাল বলেন, বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজে আমাদের বিভিন্ন সময়ে ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে উৎসাহিত করেছেন। তিনি সবকিছু অবগত রয়েছেন। চেয়ারম্যান যথাসময়েই দলের ত্যাগী নেতাকর্মী যারা আছেন, তাদের পুরস্কৃত ও সম্মানিত করবেন। এই বিশ্বাস আমার আছে।






















