তদবিরে অতিষ্ঠ প্রশাসন
- আপডেট সময় : ৯১ বার পড়া হয়েছে
টেন্ডারবাজি, কমিশন বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, ও নিয়োগ বাণিজ্যের তদবিরে অতিষ্ট সচিবালয়ের কর্মকর্তারা। এ বিষয়গুলোকে ভালো চোখে দেখছে না সচিবালয়ে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা। শুধু তাই নয়, এ সব তদ্বিরবাজরা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের সামনে প্রকাশ্যে অর্থ লেন দেন থেকে শুরু করে সকল ধরনের অনৈতিক কাজ করে যাচ্ছে। তদবিরবাজের তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের নাম এবং কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী বা এমপিদের জানানো হচ্ছে। বিষয়টিতে তারা গুরুত্ব না দিলে বা উপেক্ষা করলে সেগুলো প্রতিবেদন আকারে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হচ্ছে। পুরো কার্যক্রম মনিটরিং করছেন প্রধানমন্ত্রীর আস্থাভাজন দুই কর্মকর্তা। এতে করে সচিবালয়ের নীতিবান কর্মকর্তা কর্মচারিরা বিষয়টি দৃষ্টিকোটরে রেখেছেন। পাশাপাশি তারা পর্যবেক্ষনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দফতরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার কাছে প্রতিবেদন দাখিল করবেন।
সূত্রমতে, সরকার গঠনের পর থেকে প্রতিদিনই সচিবালয়ে দলীয় নেতাকর্মীদের ভিড় বাড়ছে। তারা নানা ধরনের আবদার নিয়ে হাজির হওয়ায় মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরাও বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছেন। এ কারণে দলীয় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীদের সপ্তাহে দু’দিন সাংগঠনিক কার্যালয়ে বসার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ও দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এবিষয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সকাল ৯টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত খালি তদবির। সেই সমস্ত তদবিরর হচ্ছে পোস্টিং-টোস্টিং নিয়ে। যেসব বিষয় দরকার আছে, সেই সব করতে হবে। কিন্তু সেগুলোকেই যদি প্রধান গুরুত্ব দেই, তাহলে তো মুশকিল হবে। জানা গেছে, তার এ মন্তব্যের পরই পর্যবেক্ষণ ও মনিটরিংয়ের বিষয়তে নীতিনির্ধারকরা গুরুত্বারোপ করেন এবং এই নজরদারির পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
এদিকে সচিবালয়ের সকল মন্ত্রনালয়ে নজরদারি শুরু করেছে গোয়েন্দা মাঠ পর্যায়ের অফিসারগন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বিএনপির আমলেই সচিবালয়ে এমন দৃশ্য পড়েনি। বিগত সময়ের সরকারের আমলে এমন অনৈতিক কাজ বিদ্যমান ছিল। সচিবালয়ে প্রবশে এতো কড়াকড়ি হলেও অপকৌশলে তদ্বিরবাজরা অনায়াশে ঢুকে পড়ছে সচিবালয়ে। বিগত সময়ের মতো যা মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ।
গোয়েন্দা সংস্থার ঊর্ধ্বতন এক কর্মকতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, টেন্ডারবাজি, কমিশন বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, ও নিয়োগ বাণিজ্যের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদন তৈরি করতে এরই মধ্যে মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি দলের নাম ভাঙিয়ে নেতাকর্মীরা কোনো অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছেন কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ইতোমধ্যে সরকারের দুইজন মন্ত্রী ও তিনজন প্রতিমন্ত্রীর কার্যকলাপের বিষয়ে প্রতিবেদন পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি আরও অন্তত ২৩ জন এমপির নেতিবাচক কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। যেসব আসনে জামায়াত জোটের এমপি রয়েছে, সেখানে বিভিন্ন কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হচ্ছে, এমপিরা কী ভূমিকা রাখছেন, তাতে স্বচ্ছতা রয়েছে কি না সে বিষয়েও প্রতিবেদন তৈরির কাজ প্রায় চলমান রয়েছে। এই সংস্থার পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের বেশিরভাগ সংসদ সদস্যই বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দ দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে বণ্টন করেছেন। ফলে সাধারণ জনগণ বঞ্চিত হচ্ছেন। তা ছাড়া যেসব আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল, সেসব স্থানে তাদের সমর্থকদের নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হতে হচ্ছে। প্রতিবেদনে এসব বিষয়ও সংযুক্ত করা হচ্ছে।
এবিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রী-এমপিদের সম্পদ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের খোঁজখবর রাখতে গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে। তারা সচিবালয়ে ডিউটি করছেন। তার কাছে নিয়মিত প্রতিবেদন দিচ্ছে ওই টিম। পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে সচিবালয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও তাদের পিএস-এপিএসদের কক্ষে প্রবেশকারীদের। তাদের নাম-ঠিকানা সংগ্রহ করে অতীত কর্মকাণ্ড খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকারের নীতিনির্ধারক ও আইনপ্রণেতারা যাতে ক্ষমতার দাপটে অতীতের অন্য কোনো শাসনামলের মতো দুর্নীতি-অনিয়ম ও কর্তৃত্ববাদিতায় আক্রান্ত ও নিমজ্জিত হতে না পারেন, সে লক্ষ্যে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কঠোর নজরদারিতে রাখা হয়েছে। সূত্র মতে, মন্ত্রী ও নির্বাচিত এমপিদের ওপর সরকারের পূর্ণ আস্থা রয়েছে এবং সে কারণেই তাদের সুনির্দিষ্ট প্রতিনিধিত্বশীলতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা যেন স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন, সেটি নিরীক্ষণেরও প্রয়োজন রয়েছে। তাই সরকারের একটি গোয়েন্দা সংস্থাকে এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় নির্দেশ ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সূত্রমতে, নজরদারির প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এরই মধ্যে দুইজন মন্ত্রী, তিনজন প্রতিমন্ত্রী ও ২৩ জন এমপির প্রশ্নবিদ্ধ কার্যক্রম সম্পর্কে সরকারকে জানানো হয়েছে। সংস্থাটিকে সচিবালয় ও মন্ত্রণালয়কেন্দ্রিক তদবিরবাজদের তালিকা পাঠানোর নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। এসব কাজ আবার সামগ্রিকভাবে ক্রস চেক করে দেখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আরেকটি সংস্থাকে।
সূত্রমতে, সরকারের একজন নারী প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যেই বেশ কয়েকটি গুরুতর অভিযোগ পাওয়া গেছে। যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে জানানোও হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, ওই আসনের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মারধরের পাশাপাশি ও তার পুকুরে কীটনাশক দিয়ে মাছ মেরে ফেলা হয়েছে। নির্যাতিতরাও বিএনপিকর্মী এবং তার সমর্থকরাই এ অপকর্ম করেছেÑ এটি জানার পরও ওই প্রতিমন্ত্রী কোনো পদক্ষেপ নেননি, বরং এখনও চুপ রয়েছেন।
এদিকে বিমানবন্দর-কেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে বিশেষ সুবিধা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনের বিরুদ্ধে। অপর এক প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেছে ট্রাভেল এজেন্সির মালিকদের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ের। ওই প্রতিমন্ত্রীর ছোটভাই নিজেই এজেন্সির মালিকদের সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় বৈঠক করেছেন।
তথ্য বলেছে, অপর এক প্রতিমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের বিশেষ উদ্দেশ্যে ফোন দিয়েছেন। অপর এক মন্ত্রীর বিরুদ্ধে ঈদের আগে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন এমপির এপিএস হিসেবে নিয়োগ পাওয়া পারিবারিক সদস্য ও দলীয় সংগঠকদের সম্পর্কেও একাধিক নেতিবাচক অভিযোগ মিলেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী ছাড়াও বিভিন্ন মহল থেকে তারা অনৈতিক ও অন্যায় সুবিধা আদায় করছেন। তদ্বিরবাজদের লাগাম এখনই টানতে না পারলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে বলে প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয়েছে।





















