ঢাকা ০৪:০১ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬

দূরের যুদ্ধে কাছের প্রভাব

মহিউদ্দিন তুষার, সিনিয়র রিপোর্টার
  • আপডেট সময় : ৩৯ বার পড়া হয়েছে
দৈনিক গনমুক্তি অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘাত বিশ্ববাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য ব্যয় বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে উঠেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের দামেও। তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে, যা শিল্প ও উৎপাদন খাতে নতুন চাপ তৈরি করবে। এর ধারাবাহিকতায় মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব হবে সবচেয়ে বেশি। দূরের এই যুদ্ধ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তাই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই কার্যকর নীতিগত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

সম্প্রতি সরকার জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছে। অকটেনের দাম ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কেরোসিনের দামও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০ টাকা। একই সঙ্গে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে পরিবহন খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় বাস চলাচল কমে গেছে প্রায় ২০ শতাংশ। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিজেল সংকট ও বাড়তি দামের কারণে অনেক বাস মালিক ও চালক নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি সংগ্রহ করতেই দিনে ৩-৪ ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে, ফলে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কমে গেছে। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারেও। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি খরচ বাড়লে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ও বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

এদিকে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতেও। মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব) জানিয়েছে, দেশে বিভিন্ন অপারেটরের মোট ২৭টি ডাটা সেন্টার রয়েছে, যেগুলো টেলিকম নেটওয়ার্কের মূল অবকাঠামো হিসেবে কাজ করে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এসব ডাটা সেন্টার বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ডাটা সেন্টার বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মোবাইল নেটওয়ার্কই নয়, বরং জরুরি সেবা, অনলাইন ব্যাংকিং, ডিজিটাল লেনদেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সরকারি সেবাসহ পুরো অর্থনৈতিক কার্যক্রমে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে।

অন্যদিকে কূটনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনাও আপাতত অনিশ্চিত। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার কোনো পরিকল্পনা নেই। দেশটির অভিযোগ, পূর্বঘোষিত যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্র লঙ্ঘন করেছে এবং সমুদ্রপথে অবরোধ আরোপের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, শিল্প উৎপাদনে ব্যাঘাত এবং মূল্যস্ফীতি সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক সংকট তৈরি হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা সরকারকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। জ্বালানি সরবরাহ বহুমুখীকরণ, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গণপরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার তদারকি জোরদারের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন। হাজার মাইল দূরের একটি ভূরাজনৈতিক সংঘাত বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলছে। তাই বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সময়োপযোগী নীতি গ্রহণই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নিউজটি শেয়ার করুন

ট্যাগস :

দূরের যুদ্ধে কাছের প্রভাব

আপডেট সময় :

মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা ও সংঘাত বিশ্ববাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করেছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে। বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য ব্যয় বৃদ্ধি অনিবার্য হয়ে উঠেছে। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যার প্রভাব পড়বে নিত্যপণ্যের দামেও। তেল-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বাড়াবে, যা শিল্প ও উৎপাদন খাতে নতুন চাপ তৈরি করবে। এর ধারাবাহিকতায় মূল্যস্ফীতির হার আরও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলতে পারে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের ওপর এর প্রভাব হবে সবচেয়ে বেশি। দূরের এই যুদ্ধ বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। তাই সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় এখন থেকেই কার্যকর নীতিগত প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

সম্প্রতি সরকার জ্বালানি তেলের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে। ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বাড়িয়ে ১১৫ টাকা করা হয়েছে। অকটেনের দাম ২০ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১৪০ টাকা এবং পেট্রোল ১৯ টাকা বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। কেরোসিনের দামও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩০ টাকা। একই সঙ্গে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন।

জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব ইতোমধ্যে পরিবহন খাতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় বাস চলাচল কমে গেছে প্রায় ২০ শতাংশ। পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানান, ডিজেল সংকট ও বাড়তি দামের কারণে অনেক বাস মালিক ও চালক নিয়মিত ট্রিপ দিতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে জ্বালানি সংগ্রহ করতেই দিনে ৩-৪ ঘণ্টা সময় নষ্ট হচ্ছে, ফলে সড়কে যানবাহনের সংখ্যা কমে গেছে। এতে যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও উঠছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের বাজারেও। পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ায় পাইকারি থেকে খুচরা পর্যায়ে পণ্যের দাম বাড়ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি খরচ বাড়লে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যয়ও বেড়ে যায়, যা শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপরই চাপিয়ে দেওয়া হয়। ফলে নিম্ন ও মধ্যআয়ের মানুষের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।

এদিকে জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতেও। মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব) জানিয়েছে, দেশে বিভিন্ন অপারেটরের মোট ২৭টি ডাটা সেন্টার রয়েছে, যেগুলো টেলিকম নেটওয়ার্কের মূল অবকাঠামো হিসেবে কাজ করে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে এসব ডাটা সেন্টার বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, ডাটা সেন্টার বন্ধ হয়ে গেলে শুধু মোবাইল নেটওয়ার্কই নয়, বরং জরুরি সেবা, অনলাইন ব্যাংকিং, ডিজিটাল লেনদেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সরকারি সেবাসহ পুরো অর্থনৈতিক কার্যক্রমে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটতে পারে। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তা জাতীয় সংকটে রূপ নিতে পারে।

অন্যদিকে কূটনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা প্রশমনের সম্ভাবনাও আপাতত অনিশ্চিত। ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন করে আলোচনার কোনো পরিকল্পনা নেই। দেশটির অভিযোগ, পূর্বঘোষিত যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্র লঙ্ঘন করেছে এবং সমুদ্রপথে অবরোধ আরোপের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট আরও গভীর হয়েছে।

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিরতা দীর্ঘায়িত হলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়তে পারে, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বড় ধরনের অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ, শিল্প উৎপাদনে ব্যাঘাত এবং মূল্যস্ফীতি সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক সংকট তৈরি হতে পারে।

এ পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা সরকারকে আগাম প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। জ্বালানি সরবরাহ বহুমুখীকরণ, বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গণপরিবহন ব্যবস্থার দক্ষতা উন্নয়ন এবং বাজার তদারকি জোরদারের মাধ্যমে সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব বলে তারা মনে করেন। হাজার মাইল দূরের একটি ভূরাজনৈতিক সংঘাত বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনে বাস্তব প্রভাব ফেলছে। তাই বৈশ্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সময়োপযোগী নীতি গ্রহণই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।