প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে হাজিপুরে বোমা মেশিনের তাণ্ডব
ইজারার আড়ালে ২৫ কোটি টাকার বালু লুট!
- আপডেট সময় : ৪২ বার পড়া হয়েছে
* আওয়ামী লীগ নেতার ভায়রা থেকে বিএনপি নেতাদের ‘পার্টনারশিপ’
* ওসির ‘মাসোহারা’ বাণিজ্যে নীরব পুলিশ!
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার হাজিপুর-আহারকান্দি বালু মহালে ইজারার শর্তের তোয়াক্কা না করে চলছে পরিবেশ ধ্বংসের মহোৎসব। নিষিদ্ধ ও পরিবেশ বিধ্বংসী ‘বোমা মেশিন’ লাগিয়ে নদীর তলদেশ থেকে বেপ্রবাহভাবে বালু ও পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতা এবং পুলিশের প্রত্যক্ষ মদদে ইজারাকৃত সীমানার বাইরে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে চলছে এই অবৈধ বালু লুটের সাম্রাজ্য। সাধারণ নৌকা ও ট্রাক থেকে রয়্যালটির নামে দ্বিগুণ টাকা হাতিয়ে নেওয়ারও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ইজারাদার চক্রের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চলতি বছর সিলেটের জেলা প্রশাসন (রাজস্ব শাখা) থেকে গোয়াইনঘাট উপজেলায় মাত্র একটি বালু মহাল ইজারা দেওয়া হয়। ‘হাজিপুর-আহারকান্দি’ নামের এই মহালটি ২৬ কোটি টাকায় ইজারা নেন ‘ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজ’-এর কর্ণধার আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি কোম্পানীগঞ্জের প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা আলফুর ভায়রা হিসেবে পরিচিত। গত ১৬ এপ্রিল আব্দুল্লাহ আল মামুন মহালটির দখল বুঝে নেওয়ার পর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনকে কাজে লাগিয়ে স্থানীয় ও জেলা পর্যায়ের শীর্ষ অন্তত ২০ জন বিএনপি ও যুবদল নেতাকে ব্যবসায় অংশীদার (পার্টনার) করেন। মে মাসের প্রথম দিকে বৈধভাবে বালু উত্তোলন শুরু হলেও, মে মাসের শেষ দিকে এসে কতিপয় বিএনপি ও যুবদল নেতার রাজনৈতিক শেল্টারে শুরু হয় অবৈধ বোমা মেশিনের তাণ্ডব।
ইজারার শর্ত অনুযায়ী, নির্ধারিত দাগ ও মৌজার ভেতরে কেবল পরিবেশসম্মত উপায়ে বালু উত্তোলন করার কথা। কিন্তু বাস্তবে ইজারাদার চক্র সদর ইউনিয়নের ভেতরে পরগনা বাজার, তিতরাই ও লাঠি পশ্চিমপাড়ে অবৈধ ক্যাম্প বসিয়ে রসিদের মাধ্যমে বেপরোয়া রয়্যালটি কালেকশন করছে। দক্ষিণ প্রতাপপুর ও কন্যাঙ্গল নদীর প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে নদীর বুক ঝাঁঝরা করে ফেলা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, বালুর রয়্যালটি প্রতি ফুট ৫ টাকার স্থলে জোরপূর্বক ১০ টাকা হারে আদায় করা হচ্ছে। ফলে একটি ২০০ ফুটের ট্রাক থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং সাধারণ নৌকাগুলো থেকে সমপরিমাণ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করে গোয়াইনঘাট থানা লেবার ফেডারেশনের সভাপতি মদরিছ আলী বলেন, “গত ১৩ এপ্রিল আমরা এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনকে একটি চিঠি দিয়েছিলাম। আমাদের দাবি ছিল, বালু মহালের সীমানায় লাল পতাকা টাঙিয়ে নির্দিষ্ট দাগ-খতিয়ান স্পষ্ট করে দেওয়া হোক। কিন্তু প্রশাসন চিঠির কোনো जवाब না দিয়ে ‘ঝুমলা’ (দাগ-খতিয়ান উল্লেখ না করে) লিজ দিয়ে দিয়েছে। এর অর্থ হলো, প্রশাসন নিজেই ইজারাদারকে সীমানার বাইরে বেআইনি কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পরিবেশ ধ্বংসের এই ভয়ংকর খেলায় সরাসরি জড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন। সদর বিট অফিসার ও পশ্চিম জাফলং বিট অফিসারের মাধ্যমে গোয়াইনঘাট থানার ওসিকে সম্পূর্ণ ‘ম্যানেজ’ করে এই অবৈধ কাজ চালানো হচ্ছে। প্রশাসনের পকেটে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা যাওয়ার কারণেই পুলিশ নদী ও পরিবেশ রক্ষায় সম্পূর্ণ নীরব ভূমিকা পালন করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গোয়াইনঘাট থানার ওসির সরাসরি মদদে এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) রহস্যজনক নির্বিকার ভূমিকার সুযোগ নিয়ে প্রতি রাতে কামরুল-খায়রুল গংরা বোমা মেশিন চালিয়ে নদীর তলদেশ ধ্বংস করছে।
সব অভিযোগ অস্বীকার করে ভাই ভাই এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আব্দুল্লাহ আল মামুন দাবি করেন, “আমরা সরকারের সব নিয়ম মেনেই বালু উত্তোলন করছি। ইজারার শর্তের বাইরে বা সীমানার বাইরে কোনো কাজ করা হচ্ছে না। বোমা মেশিন চালানোর অভিযোগ সত্য নয়।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান বলেন, “অবৈধ বোমা মেশিন দিয়ে এবং ইজারার বাইরে বালু উত্তোলন করার কোনো সুযোগ নেই। এমনটা হলে পুলিশ দ্রুত কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেবে।”
গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, “আমরা খবর পাওয়া মাত্রই অভিযান চালিয়ে বোমা মেশিন বন্ধ করে দিয়েছি। এরপরও চললে আবার অভিযান হবে।” তবে লিজের সীমানা লঙ্ঘনের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কিছুটা দায় এড়িয়ে বলেন, “লিজ দিয়েছেন ডিসি ও এডিসি স্যার। আপনারা উনাদের কাছে জানতে চান। আমাকে শুধু দখল বুঝিয়ে দিতে বলা হয়েছিল, আমি বুঝিয়ে দিয়েছি।”
এ প্রসঙ্গে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মো. নুরের জামান চৌধুরী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “ইজারাদার যদি কোনোভাবেই লিজের শর্ত ভঙ্গ করেন বা সীমানার বাইরে যান, তবে তাঁর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো অবস্থাতেই বোমা মেশিন ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। আমরা বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করছি।”
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, অবিলম্বে টাস্কফোর্সের মাধ্যমে অভিযান চালিয়ে এই ‘বোমা মেশিন’ সিন্ডিকেটকে গ্রেপ্তার করা হোক এবং নদী ও পরিবেশকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা হোক।




















