চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড: কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত
- আপডেট সময় : ৩৯৪ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বানিজ্যের সদর দরজা চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার কাজ সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডকে দেওয়ার বিষয়ে, আলোচনা শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, টার্মিনালটির পরিচালন দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়িয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের প্রতিযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যেই এই উদ্যোগের নিয়েছে সরকার।
বিনিয়োগ প্রস্তাবের প্রেক্ষাপট
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে এনসিটি পরিচালনা নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) এবং পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামোয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগের অংশ হিসেবে বিষয়টি আলোচনায় আসে।
এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ-ইউএই যৌথ পিপিপি প্ল্যাটফর্মের প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠকে বন্দর খাতে, বিশেষ করে এনসিটিতে বিনিয়োগের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। পরবর্তী বৈঠকগুলোতেও এটি আলোচ্যসূচিতে ছিল। সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত চতুর্থ বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। বর্তমানে দুই পক্ষের মধ্যে শর্ত, বিনিয়োগ এবং পরিচালনা কাঠামো নিয়ে আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এনসিটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার পরিচালনার অন্যতম প্রধান অবকাঠামো হলো নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়তে থাকায় বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ২০০০ সালের দিকে টার্মিনালটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৭ সালে এর অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হয়। পাঁচটি জেটিসমৃদ্ধ এ টার্মিনাল নির্মাণে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৫৮২ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়।
বন্দর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে টার্মিনালের অবকাঠামো সচল থাকলেও ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা কমে যাওয়ায় কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদনশীলতা অর্জন করা যাচ্ছে না। এ অবস্থায় সক্ষমতা বাড়াতে নতুন বিনিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং উন্নত পরিচালন ব্যবস্থা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে এনসিটিতে প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২০ থেকে ২২টি কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি ও পরিচালন দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে এ সক্ষমতা আরও বাড়ানো সম্ভব বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
কেন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর
বিশ্বের অনেক সমুদ্রবন্দরে টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব আন্তর্জাতিক অপারেটরদের দেওয়া হয়। বন্দর পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বৈশ্বিক শিপিং ও লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ জোরদারের লক্ষ্যেই এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বন্দর-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর যুক্ত হলে কেবল কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি বাড়ে না, বরং পরিচালনা পদ্ধতি, প্রযুক্তি ব্যবহার, জনবল উন্নয়ন এবং সেবা ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন আসে। তবে এর সফলতা নির্ভর করে চুক্তির শর্ত, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থ কতটা সুরক্ষিত থাকছে, তার ওপর।
কেন ডিপি ওয়ার্ল্ড
ডিপি ওয়ার্ল্ড সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মালিকানাধীন দুবাই ওয়ার্ল্ড গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশে প্রতিষ্ঠানটি বন্দর, টার্মিনাল ও লজিস্টিকস কার্যক্রম পরিচালনা করে।
সরকারের সঙ্গে চলমান আলোচনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশে বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এ বিনিয়োগের পরিমাণ, ধরন ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা এখনও চলমান।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আধুনিক টার্মিনাল পরিচালন ব্যবস্থা চালু হলে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের গতি বাড়তে পারে। এতে জাহাজের বন্দরে অবস্থানের সময় কমবে এবং আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম আরও দ্রুত সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এর ফলে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কমানো এবং বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণ
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে সম্ভাব্য চুক্তি হবে টার্মিনাল পরিচালনা ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা বিষয়ে। বন্দরের নিরাপত্তা, জলসীমা, শুল্ক কার্যক্রম কিংবা রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ চুক্তির আওতায় থাকবে না।
তাদের মতে, বন্দরের নিরাপত্তা, বহির্নোঙর এলাকা, কাস্টমস কার্যক্রম এবং আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিষয় আগের মতোই চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ কাস্টমস এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় সংস্থার নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
এ ছাড়া টার্মিনালে ব্যবহৃত অপারেটিং সিস্টেমের তথ্য রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যবেক্ষণ করতে পারবে বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
ল্যান্ডলর্ড মডেল
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সম্ভাব্য চুক্তির ভিত্তি হতে পারে ‘ল্যান্ডলর্ড পোর্ট মডেল’। এ ব্যবস্থায় বন্দরের জমি, জেটি এবং স্থায়ী অবকাঠামোর মালিকানা রাষ্ট্রের কাছেই থাকে। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি অপারেটরকে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে বা শর্ত ভঙ্গ হলে সরকার প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে অপারেটর পরিবর্তনের সুযোগ রাখে। এ ধরনের মডেলে অপারেটর পরিচালনা ও বিনিয়োগের দায়িত্ব পালন করলেও রাষ্ট্র নির্ধারিত ফি, লিজ ভাড়া বা রয়্যালটি পেয়ে থাকে। বিশ্বের বিভিন্ন সমুদ্রবন্দরে এ ধরনের মডেল অনুসরণ করা হয়।
বাংলাদেশ-ইউএই অর্থনৈতিক সম্পর্ক
সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার। দেশটিতে ১২ লাখের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন এবং প্রবাসী আয়ের অন্যতম বড় উৎসও ইউএই। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে কয়েক বছর ধরে আলোচনা চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশ ও ইউএইর দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আগামী কয়েক বছরে এ বাণিজ্য আরও বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে দুই দেশ।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড যুক্ত হলে বন্দর পরিচালনায় নতুন বিনিয়োগ, প্রযুক্তি ও দক্ষতা যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনার ফলাফল এবং সম্ভাব্য চুক্তির শর্তের ওপর।





















