দাগনভূঞা ইউএনও’র বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ, তদন্ত দাবি
- আপডেট সময় : ৩২ বার পড়া হয়েছে
ফেনীর দাগনভূঞা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. শাহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ, দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ভুক্তভোগী ও সচেতন মহল দাবি করছেন, ঘুষ ছাড়া তার দপ্তরে কোনো ফাইল নড়ে না, যার ফলে সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। এসব অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও শাহীদুল ইসলাম অবশ্য দাবি করেছেন, এগুলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং তার বিরুদ্ধে সুবিধা নিতে না পারা ব্যক্তিরাই এসব ছড়াচ্ছেন।
সংবিধান অনুযায়ী, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা জনগণের সেবক এবং তাদের মূল দায়িত্ব জনস্বার্থে কাজ করা। তবে দাগনভূঞার ইউএনও মো. শাহীদুল ইসলামের বিরুদ্ধে দায়িত্ব পালনে অবহেলা এবং ব্যক্তিগত স্বার্থে ঘুষ ও কমিশন বাণিজ্যে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি নির্দিষ্ট সময়ে অফিসে আসেন না এবং তার বাসায় ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
অভিযোগ রয়েছে, ইউএনও শাহীদুল ইসলাম খাল কাটা মাটি বিক্রি থেকে শুরু করে টিআর, কাবিখা এবং সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প থেকে ১২ শতাংশ হারে কমিশন আদায় করেন। গত এডিপি প্রকল্পের ৫ কোটি টাকার মধ্যে ৩ কোটির টেন্ডার দেওয়া হলেও ২ কোটির কোনো টেন্ডার দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে উপজেলা প্রকৌশলীর সাথে তার বাগবিতণ্ডাও হয়। এছাড়া, পৌরসভার ৫ লক্ষ টাকার টিআর নিজের নামে আনলেও উপজেলা অফিসার্স ক্লাবে দৃশ্যমান কোনো কাজ হয়নি। গত জাতীয় নির্বাচনের সময় ভোট কেন্দ্রের সিসি ক্যামেরার টেন্ডারও তিনি নিজের নামে নেন, কিন্তু অনেক কেন্দ্রে ক্যামেরা দেখা যায়নি। ভোট কেন্দ্রের উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ কয়েক কোটি টাকাও তিনি আত্মসাৎ করেছেন বলে জনশ্রুতি আছে।
এক ভুক্তভোগী কুয়েত প্রবাসী ইসমাইল হোসেন প্রতিবেদককে জানান, উপজেলা পরিষদের সামনের খালে ড্রেজিং করে তোলা মাটি ইউএনও স্যার তার অফিস সহকারীর মাধ্যমে গাড়িভেদে এক থেকে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করেছেন। তিনি নিজেও মাটি কিনতে চাইলে জানতে পারেন, এটি গোপনে বিক্রি হচ্ছে এবং এর টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয়নি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি অভিযোগ করেন, ইউএনও শাহীদুল সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প থেকে শুরু করে টিআর, কাবিখাসহ সব প্রকল্পে ১২ শতাংশ কমিশন নেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “তিনি কি ইউএনও, না কমিশন এজেন্ট?”
রহিমা বেগম নামে আরেক ভুক্তভোগী জানান, তাদের পরিবারের একটি অভিযোগের বিষয়ে ইউএনও কার্যালয়ে টাকা না দিলে কাজ হবে না বলে জানানো হয়। টাকা দেওয়ার পরও কাজ না হওয়ায় পরে অনেকবার তাগিদ দেওয়ার পর শুনানি হয়েছে।
দৈনিক গণমুক্তির দাগনভূঞা প্রতিনিধি শাখাওয়াত হোসেন টিপু অভিযোগ করেন, দাগনভূঞা উত্তর আলীপুর স্কুল এন্ড কলেজের দুর্নীতির সংবাদ সংগ্রহ করতে গেলে সহকারী প্রধান শিক্ষক এনামুল হক তাদের ঘুষ দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং প্রধান শিক্ষক জহির উদ্দিন তাদের হেনস্থা করেন। পরে তিনিসহ আরও দুইজন সাংবাদিক ইউএনও কার্যালয় ও ডিসি অফিসে অভিযোগ করলেও ইউএনও শাহীদুল ইসলাম টাকা খেয়ে দুই শিক্ষককে স্বপদে বহাল রাখেন। টিপু জানান, তারা ইউএনও’র বিরুদ্ধে ডিসি অফিসে অভিযোগ দেবেন এবং প্রয়োজনে মামলা করবেন।
সাইফুল ইসলাম নামে এক ভুক্তভোগী ইউএনও শাহীদুলকে ‘এতবড় দুর্নীতিবাজ’ আখ্যা দিয়ে বলেন, তিনি টিআর কাবিখা প্রকল্পের লোকদের ‘এভাবে এভাবে করেন… আপনার লাভ হবে। চেক তো আমি ইস্যু করব, অসুবিধা নাই। টেনশন কইরেন না’ বলে বুদ্ধি দেন।
উপজেলা বিএনপি’র সহ-সভাপতি আবুল হাসেম বাহাদুর চেয়ারম্যান বলেন, দাগনভূঞা উপজেলায় অনেক ইউএনও এসেছেন এবং গেছেন, কিন্তু শাহীদুলের মতো ‘অযোগ্য, অথর্ব, দুর্নীতিবাজ” আর কেউ আসেননি। প্রতিদিন কারো না কারো অভিযোগ তাদের কাছে আসে, যা শুনতে শুনতে তারা বিরক্ত।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ইউএনও মো. শাহীদুল ইসলাম বলেন, ‘আপনারা সাংবাদিকরা যাচাই করুন। এগুলো আমার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে করা হচ্ছে। যারা আমার কাছ থেকে কোনো সুবিধা নিতে পারেনি, তারাই এসব করছে। আর যেসব লোক আমার বিরুদ্ধে কথা বলছে, হয়তো কোনো বিচারের শুনানি তাদের পক্ষে যায়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘ঘুষ দুর্নীতির অভিযোগগুলো আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ তদন্ত করবে। যদি আমি প্রমাণিত হই, তাহলে আমার কর্তৃপক্ষ যে শাস্তি দেবে, তা মাথা পেতে নেব।’
এদিকে, স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে, ইউএনও’র সার্বিক কার্যক্রম সঠিকভাবে তদারকি হচ্ছে কি না। অনেকেই মনে করছেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হলে সিভিল প্রশাসনের প্রতি জনগণের আস্থা আরও বৃদ্ধি পাবে। স্থানীয় সচেতন মহল প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র জনসম্মুখে তুলে আনা উচিত, যাতে জনসেবামূলক কার্যক্রমে ঘুষ, দুর্নীতি ও কমিশন বাণিজ্যের কারণে কোনো ধরনের ব্যাঘাত না ঘটে।




















