চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় ডিপি ওয়ার্ল্ড: কৌশলগত অংশীদারিত্বের নতুন দিগন্ত
- আপডেট সময় : ২৯ বার পড়া হয়েছে
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হতে যাচ্ছে। কৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) স্বনামধন্য টার্মিনাল অপারেটর ‘ডিপি ওয়ার্ল্ড’ এর সাথে বাংলাদেশ সরকারের আলোচনা ও দরকষাকষি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এটি হঠাৎ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়, বরং দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দ্বিপাক্ষিক আলোচনা, গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক মানের বন্দর ব্যবস্থাপনার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এই উদ্যোগ আলোর মুখ দেখছে। টার্মিনালটির পরিচালন দক্ষতা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বাংলাদেশের অবস্থান আরও সুদৃঢ় করতেই মূলত এই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানকে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
**বিনিয়োগ প্রস্তাব বাংলাদেশের**
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক আলোচনা ২০১৯ সালে শুরু হয়েছিল। তখন সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে একটি জিটুজি (সরকার-টু-সরকার) ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কাঠামোর অধীনে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ সরকারই ডিপি ওয়ার্ল্ডকে বন্দর খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তাব দেয়। বাংলাদেশ-ইউএই জয়েন্ট পিপিপি প্ল্যাটফর্মের প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠকে বন্দর খাতে, বিশেষ করে এনসিটিতে বিনিয়োগের বিষয়টি আলোচিত হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অনুষ্ঠিত তৃতীয় প্ল্যাটফর্ম বৈঠকেও এটি অন্যতম প্রধান এজেন্ডা ছিল। বর্তমান সরকারের শুরুর দিকে এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত চতুর্থ প্ল্যাটফর্ম বৈঠকেও এটি প্রধান এজেন্ডা হিসেবে আলোচনা হয়েছে। এই আলোচনার পথ ধরেই ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে দরকষাকষি ও বাংলাদেশের স্বার্থ সমুন্নত রেখে বিনিয়োগ প্রস্তাব চূড়ান্ত করার কাজ এগিয়ে নিচ্ছে সরকার।
**নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি)**
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের আধুনিকায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধির ইতিহাসে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং কৌশলগত একটি মাইলফলক। কনটেইনার হ্যান্ডলিং ক্ষমতা বাড়াতে এটি নির্মিত হয়েছিল। আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় বন্দরের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় ২০০০ সালের দিকে এনসিটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০০৭ সালে টার্মিনালের জেটি ও অবকাঠামোগত নির্মাণ কাজ শেষ হয়। পাঁচটি জেটি সমৃদ্ধ এই টার্মিনাল নির্মাণে বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব তহবিল থেকে প্রায় ৫৮২ কোটি টাকা ব্যয় হয়। চালুর পর থেকেই আধুনিক যন্ত্রপাতি সমৃদ্ধ এই টার্মিনাল নিরবচ্ছিন্নভাবে হ্যান্ডলিং করলেও, যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা কমেছে এবং উৎপাদনশীলতা হ্রাস পেয়েছে। বৈশ্বিক মান যেখানে গড়ে ৯৩ শতাংশ, সেখানে এনসিটিতে যন্ত্রপাতির সহজলভ্যতা প্রায় ৭০ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, অবকাঠামোগত সুবিধা থাকার পরও যন্ত্রপাতির পূর্ণ কার্যক্ষমতার অভাবে কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হচ্ছে না। এই সক্ষমতা বাড়াতে প্রয়োজন বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ। বর্তমানে প্রতি ঘণ্টায় ২০-২২টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং হলেও, আন্তর্জাতিক মান বিবেচনায় একই সময়ে ৩০টি কনটেইনার হ্যান্ডলিং সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
**কেন আন্তর্জাতিক টার্মিনাল অপারেটর?**
টার্মিনাল অপারেশনে ইন্টারন্যাশনাল টার্মিনাল অপারেটর (আইটিও) যুক্ত করার বিষয়টি কেবল ক্রেন বা জাহাজ পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি মূলত একটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, বৈশ্বিক লজিস্টিকস চেইন এবং ভূরাজনীতির সাথে গভীরভাবে জড়িত একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত। কোনো দেশের প্রবেশদ্বার বা বন্দরকে বিশ্বমানের করে গড়ে তুলতে এবং এর পরিচালন ক্ষমতাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে আন্তর্জাতিক অপারেটরদের নিয়োগ দেওয়া হয়। এর পেছনে রয়েছে বিশাল মূলধন ও বিনিয়োগ, উন্নত পরিচালন সক্ষমতা, আধুনিক প্রযুক্তি, বৈশ্বিক লজিস্টিকস নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগ, স্বচ্ছতা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং বন্দরের সামগ্রিক রূপান্তর।
**ডিপি ওয়ার্ল্ড কেন?**
ডিপি ওয়ার্ল্ড সংযুক্ত আরব আমিরাত সরকারের মালিকানাধীন একটি বহুজাতিক কোম্পানি, যা দুবাই ওয়ার্ল্ডের অধীনে পরিচালিত হয়। এটি বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম টার্মিনাল অপারেটর, যা প্রায় ৭০টিরও বেশি দেশে ৮০টি টার্মিনাল ও লজিস্টিকস কার্যক্রম পরিচালনা করে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড বাংলাদেশে লজিস্টিকস ও অবকাঠামো খাতে প্রায় ১ বিলিয়ন (১০০ কোটি) ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে। তাদের উন্নত অপারেটিং সিস্টেম ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থাপনার কারণে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি বৈশ্বিক মানের (ঘণ্টায় ৩৫ একক কনটেইনার) হবে, যা জাহাজের বন্দরে অবস্থান করার সময় বা ‘টার্ন-অ্যারাউন্ড টাইম’ অনেক কমিয়ে আনবে। এতে দীর্ঘমেয়াদে রাজস্ব বৃদ্ধি, আমদানিকারক ও রপ্তানিকারকদের খরচ সাশ্রয় এবং বন্দরের ব্যয় সাশ্রয় হবে। এছাড়া, ডিপি ওয়ার্ল্ডের বৈশ্বিক নেটওয়ার্ক চট্টগ্রাম বন্দরকে আন্তর্জাতিক শিপিং লাইনগুলোর সাথে সরাসরি যুক্ত করবে।
**নিরাপত্তার চাবিকাঠি দেশ ও বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই**
ডিপি ওয়ার্ল্ডের সাথে চুক্তি হবে শুধুমাত্র ‘টার্মিনাল অপারেশন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনা’ সংক্রান্ত, কোনোভাবেই নিরাপত্তা বা সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরের বিষয় নয়। বন্দর এলাকার সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বহির্নোঙর নজরদারি এবং সাইবার গেটওয়ে নিয়ন্ত্রণ সম্পূর্ণভাবে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ও দেশীয় নিরাপত্তাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। চট্টগ্রাম বন্দর একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এবং আইএসপিএস (ইন্টারন্যাশনাল শিপ অ্যান্ড পোর্ট ফ্যাসিলিটি সিকিউরিটি) কোড কমপ্লায়েন্ট বন্দর। এই বৈশ্বিক কোডের নিয়ম অনুযায়ী, টার্মিনালের চূড়ান্ত নিরাপত্তার চাবিকাঠি থাকবে বন্দরের হাতে। ডিপি ওয়ার্ল্ড বন্দরে যে স্বয়ংক্রিয় টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম (টিওএস) ব্যবহার করবে, তার প্রতিটি ডেটা এবং সিসিটিভি ফিড রিয়েল-টাইমে বাংলাদেশ কাস্টমস, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সাথে সরাসরি সংযুক্ত থাকবে। ফলে বন্দরের ভেতরে কোন কনটেইনার আসছে বা যাচ্ছে, তার প্রতিটি তথ্যের ওপর রাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকবে।
**ল্যান্ডলর্ড মডেলের উৎকৃষ্ট প্রয়োগ**
বিশ্বজুড়ে আধুনিক এবং বড় বড় সমুদ্রবন্দরগুলোর প্রায় ৮০ শতাংশেরও বেশি বর্তমানে ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’ নীতিতে পরিচালিত হয়। রটারড্যাম, সিঙ্গাপুর, কিংবা দুবাইয়ের মতো বিশ্বসেরা বন্দরগুলো এই মডেল ব্যবহার করেই সফল হয়েছে। ল্যান্ডলর্ড মডেলে বন্দরের জমি, জেটি, জলসীমা এবং যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তির মূল মালিকানা চিরকাল রাষ্ট্রের হাতেই থাকে। কোম্পানিটিকে কেবল একটি নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য ‘অপারেশন বা পরিচালনার লাইসেন্স’ দেওয়া হয়। মেয়াদ শেষে বা শর্ত ভঙ্গ করলে সরকার যেকোনো সময় তাদের বের করে দিতে পারে। এই মডেলে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের দায়িত্ব বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক অপারেটরের ওপর চলে যায়, ফলে সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমে। অপারেটর লাভ করুক বা না করুক, ল্যান্ডলর্ড মডেলের চুক্তি অনুযায়ী রাষ্ট্র প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ স্থির রয়্যালটি, লিজ রেন্ট এবং প্রতি কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের ওপর নির্দিষ্ট ফি সরাসরি পেয়ে যায়।
**বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সম্পর্ক সুদূরপ্রসারী ও কৌশলগত**
সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) সাথে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর, গতিশীল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মধ্যে আরব আমিরাত বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ অর্থনৈতিক অংশীদার। বর্তমানে প্রায় ১২ লাখের বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি সেখানে বসবাস করছেন এবং দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ রেমিট্যান্স উৎস। দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ বর্তমানে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার, যা ২০৩০ সালের মধ্যে ১০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালে ডিপি ওয়ার্ল্ডের অন্তর্ভুক্তি কেবল একটি টার্মিনাল ব্যবস্থাপনার চুক্তি নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ব্লু-ইকোনমি ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে এগিয়ে যাওয়ার এক দূরদর্শী কৌশল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।






















